কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-তে আরও উন্নত মডেল তৈরির জন্য নিজেদের কম্পিউটিং ক্ষমতার একাংশ গবেষণায় ব্যবহার করছে গুগল (Google)। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে ক্লাউড ব্যবসা থেকে সম্ভাব্য আয় হাতছাড়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থার সিইও সুন্দর পিচাই (Sundar Pichai)। বিগ টেকনোলজি পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্য, অত্যাধুনিক AI গবেষণাকে প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা দিতে গিয়ে গুগল ক্লাউডের বাণিজ্যিক চাহিদা ও গবেষণার প্রয়োজনের মধ্যে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য রয়েছে প্রযুক্তি ব্যবসার বাইরেও। কারণ, গুগল ক্লাউডের পরিষেবা ব্যবহারকারী সংস্থাগুলির চাহিদা বাড়ছে, অথচ AI মডেল তৈরি ও চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় চিপ, সার্ভার এবং ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো সহজ হচ্ছে না। পিচাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালে নতুন গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা দেওয়া কঠিন হতে পারে।
পিচাইয়ের এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন গুগলের ক্লাউড ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে গুগল ক্লাউডের আয় ছিল ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ভবিষ্যতে আয় হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা চুক্তির পরিমাণও প্রায় ৫১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ, পরিষেবার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেই চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
গুগলের এই অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রয়েছে গুগল ডিপমাইন্ড (Google DeepMind)। পিচাইয়ের মতে, পরবর্তী প্রজন্মের আরও উন্নত AI মডেল তৈরি করতে গবেষকদের পর্যাপ্ত কম্পিউটিং ক্ষমতা দেওয়া অপরিহার্য। সেই ক্ষমতা ক্লাউড গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করলে তা থেকে তাৎক্ষণিক আয় হতে পারত। কিন্তু তার বদলে সংস্থার নিজস্ব AI গবেষণায় কিছু সংস্থান ব্যবহার করা হচ্ছে। কত টাকার সম্ভাব্য আয় এ ভাবে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তা অবশ্য পিচাই নির্দিষ্ট করে জানাননি।
এই সংকট শুধু চিপের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। AI-র জন্য প্রয়োজনীয় সার্ভার, বিদ্যুৎ, ডেটা সেন্টারের জায়গা এবং পরিকাঠামো তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগে। পিচাইয়ের বক্তব্য, বর্তমানে যে কম্পিউটিং ক্ষমতা গুগলের হাতে রয়েছে, তার অনেকটাই কয়েক বছর আগে নেওয়া বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের ফল। ফলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন ক্ষমতা তৈরি করে গ্রাহকদের পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।
এই পরিস্থিতিতে গুগলের মূল চ্যালেঞ্জ হল, একদিকে নিজেদের উন্নত AI মডেল তৈরি ও চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থান নিশ্চিত করা, অন্যদিকে অর্থ দিয়ে ক্লাউড পরিষেবা নিতে চাওয়া গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করা। নতুন গ্রাহকদের জন্য কম্পিউটিং ক্ষমতা পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে পিচাইয়ের মন্তব্য সেই চাপেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই সীমাবদ্ধতার কারণে কোন গ্রাহক কতটা পরিষেবা পাবেন, সে বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট তালিকা বা পরিমাণ তিনি প্রকাশ করেননি।
AI পরিকাঠামো সম্প্রসারণে গুগলের বিনিয়োগও বিপুল। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে অ্যালফাবেটের মূলধনী ব্যয় ১৯৫ থেকে ২০৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। এই ব্যয়ের বড় অংশ AI এবং ক্লাউড পরিকাঠামো সম্প্রসারণে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এত বড় বিনিয়োগ সত্ত্বেও নতুন ক্ষমতা তৈরি করে বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে সময় লাগবে বলেই পিচাইয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।
গুগলের কৌশল তাই শুধু ক্লাউড থেকে তাৎক্ষণিক আয় বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংস্থাটি উন্নত AI মডেল তৈরিতে এগিয়ে থাকতে কম্পিউটিং ক্ষমতার বড় অংশ গবেষণায় ব্যবহার করতে চাইছে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছু বাণিজ্যিক সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে, কিন্তু পিচাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নত AI-র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই বিনিয়োগ ও অগ্রাধিকার জরুরি।



