বিশ্ব ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা যত বাড়ছে, ততই টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একাধিক দেশে টেস্ট ম্যাচে গ্যালারি ফাঁকা থাকছে, ওয়ানডে ক্রিকেটকেও ধরে রাখতে হচ্ছে দর্শকদের আগ্রহ। এই পরিস্থিতিতে লাল বলের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ফেরানো এবং ৫০ ওভারের ফরম্যাটকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা করছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC)। আগামী নভেম্বরের বৈঠকে ক্রিকেটের দুই ফরম্যাটের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে।
টেস্ট ক্রিকেটের ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ দর্শকদের মাঠে ফেরানো এবং আয়োজকদের আর্থিক ক্ষতি কমানো। অন্যদিকে, ওয়ানডে বিশ্বকাপের আকর্ষণ ধরে রাখার পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে আরও বিস্তৃত করার ভাবনাও রয়েছে। তবে কোন প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পাবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
টেস্ট ক্রিকেটে দর্শক কমছে, উদ্বেগে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা
টেস্ট ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে চলা সিরিজের কথা। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ডারবানে প্রথম টেস্টের প্রথম তিন দিনে মোট দর্শকসংখ্যা ১৫ হাজারও ছুঁতে পারেনি। অথচ স্টেডিয়ামটির আসনসংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার।
একই সময়ে ডারবানে ফুটবল ম্যাচ দেখতে বিপুল দর্শকের উপস্থিতি ক্রিকেটের জন্য উদ্বেগজনক তুলনা তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অরল্যান্ডো পাইরেটস ও মামেলোদি সানডাউনসের একটি ফুটবল ফাইনাল দেখতে মাঠে হাজির হয়েছিলেন প্রায় ৫০ হাজার দর্শক। এই পরিসংখ্যান টেস্ট ক্রিকেটের দর্শক টানার ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
তবে শুধু একটি ম্যাচের দর্শকসংখ্যা দিয়ে বিশ্বজুড়ে টেস্ট ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন দেশের মাঠ, সম্প্রচার, টিকিটের দাম এবং স্থানীয় দর্শকদের পছন্দও এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে কী বদল আনতে পারে আইসিসি?
টেস্ট ক্রিকেটকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তুলতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (World Test Championship) চালু করেছিল আইসিসি। এই প্রতিযোগিতা চালু থাকলেও ফরম্যাটকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০৩১ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ফিউচার ট্যুরস প্রোগ্রাম (FTP) নির্ধারিত রয়েছে। ফলে তার মধ্যে বড়সড় পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত। বরং ২০৩১ সালের পর টেস্ট ক্রিকেটের কাঠামো কীভাবে সাজানো হবে, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে আইসিসি।
একসময় টেস্ট ক্রিকেটের দর্শক টানতে দিন-রাতের ম্যাচ চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই ফরম্যাটের ব্যবহার কমেছে। কোন সিরিজে গোলাপি বলে দিন-রাতের টেস্ট হবে, তা মূলত সংশ্লিষ্ট দলগুলির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। সব সিরিজে দিন-রাতের ম্যাচ বাধ্যতামূলক করার নিয়ম নেই।
টেস্ট ক্রিকেটের জন্য দুই স্তরের বা ‘টু-টায়ার’ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছিল। তবে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের দাবি, সেই পথে এগোনোর সম্ভাবনা নেই। বরং বর্তমান কাঠামো বজায় রেখেই কীভাবে দর্শকদের আগ্রহ বাড়ানো যায়, সেই দিকেই নজর দিতে পারে আইসিসি।
ওয়ানডে বিশ্বকাপেও নতুন পরিকল্পনা
টেস্টের পাশাপাশি ওয়ানডে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎও আইসিসির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে। টি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা বাড়লেও ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ এখনও ক্রিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা। তাই এই টুর্নামেন্টকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া ও জিম্বাবোয়েতে আয়োজিত হতে চলা ওয়ানডে বিশ্বকাপকে ঘিরে নতুন কিছু ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে একটি সুপার সিরিজের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তিনটি দল অংশ নেবে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করতে একাধিক বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। সেই কর্মসূচিতে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের উপস্থিতি এবং জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভাবনাও রয়েছে।
তবে সুপার সিরিজের কাঠামো, ম্যাচের বিন্যাস এবং সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনাগুলির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
২০৩০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাড়বে দলের সংখ্যা?
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে নতুন পরিকল্পনার ইঙ্গিত। প্রতিবেদনের দাবি, ২০২৮ সালের প্রতিযোগিতায় বর্তমান ফরম্যাট মোটামুটি বজায় থাকতে পারে। তবে ২০৩০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
আরও বেশি দেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে সুযোগ দিলে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক প্রসার বাড়তে পারে। তবে দলের সংখ্যা কত হবে, প্রতিযোগিতার ফরম্যাট কীভাবে বদলাবে এবং প্রস্তাবটি কবে চূড়ান্ত হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, টেস্ট ক্রিকেটের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো, ওয়ানডে বিশ্বকাপের আকর্ষণ ধরে রাখা এবং টি-টোয়েন্টির আন্তর্জাতিক পরিসর বাড়ানো—এই তিনটি বিষয় আইসিসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নভেম্বরের বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার উপর নির্ভর করবে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পরবর্তী পদক্ষেপ।



