এক দিনেই উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা ও মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হল দুই অভিযুক্তের। পুলিশের দাবি, দুই ক্ষেত্রেই ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময় পুলিশকর্মীদের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তাঁরা এবং গুলি চালান। পাল্টা গুলিতে দু’জনের মৃত্যু হয়। তবে দুই পৃথক ঘটনায় প্রায় একই ধরনের বর্ণনা সামনে আসায় পুলিশের ভূমিকা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার ভোররাতে গাইঘাটায় ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় ধৃত প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যু হয়। একই দিন দুপুরে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে ব্যবসায়ী তথা বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় ধৃত সামাউন শেখের মৃত্যু হয় পুলিশের গুলিতে। দুই ঘটনাতেই পুলিশের বক্তব্য, অভিযুক্তেরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়েছিলেন। তবে ঘটনাগুলির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও প্রমাণ যাচাইয়ের আগে পুলিশের বর্ণনার স্বাধীন সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
গাইঘাটার ঘটনার পর মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে একই ধরনের পরিস্থিতির কথা সামনে আসায় দুই ঘটনার তুলনা শুরু হয়েছে। এর আগে জুলাই মাসে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলেরও পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনায়ও অপরাধের পুনর্নির্মাণের পর পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
গাইঘাটায় কী ঘটেছিল? পুলিশের দাবি, গাইঘাটায় অপরাধের পুনর্নির্মাণ শেষে ফেরার পথে বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে গাড়ি থামাতে বলেন প্রহ্লাদ। এরপর এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তিনি তিন রাউন্ড গুলি চালান বলে অভিযোগ। একটি গুলি পুলিশের গাড়িতে লাগে। এই ঘটনায় এক পুলিশকর্মী আহত হন বলে পুলিশ সূত্রে খবর। পাল্টা চার রাউন্ড গুলি চালায় পুলিশ। তাতে জখম প্রহ্লাদকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
গাইঘাটার ঘটনায় নিহত কিশোরী শনিবার রাতে বাড়ির কাছে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিল। পরিবারের দাবি, রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ ফোন পেয়ে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর সে আর বাড়ি ফেরেনি। রবিবার সকালে তার ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে প্রহ্লাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে প্রহ্লাদের মৃত্যুর পর মামলার বাকি তদন্ত এবং সম্ভাব্য অন্য কারও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
ধুলিয়ানে সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় কী হল? মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের পুরাতন ডাকবাংলা এলাকায় ব্যবসায়ী তথা বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের ঘটনায় ধৃত সামাউন শেখকে মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় সামাউন এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং তিন রাউন্ড গুলি চালান। পাল্টা গুলিতে জখম হওয়ার পর তাঁকে জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
গত ২৮ অগস্ট নিখোঁজ হয়েছিলেন সুজিত। পরে তাঁর খণ্ডবিখণ্ড দেহ উদ্ধার হয়। এই মামলায় আগে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সামাউনের মৃত্যুর পর বাকি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্তের গতিপ্রকৃতি কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এনকাউন্টার নিয়ে শাসক ও বিরোধীদের বক্তব্য: দুই ঘটনার পর পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতভেদ দেখা দিয়েছে। রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, অপরাধ দমনে পুলিশকে কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে এবং মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে। বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথও পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। অন্য দিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, পুলিশ যে পরিস্থিতিতে গুলি চালিয়েছে, তা প্রশাসনই ব্যাখ্যা করতে পারবে। তাঁর মতে, ‘এনকাউন্টার’ এবং পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় গুলি চালানো এক বিষয় নয়।
কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত করার দায়িত্ব আদালতের, নাকি পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের? তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও মনে করিয়ে দিয়েছেন, দেশে আইন রয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই শাস্তি হওয়া উচিত। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী পুলিশের কাছ থেকে কী ভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআরও গাইঘাটার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
দুই ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য, অভিযুক্তেরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালানোয় আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালাতে হয়েছিল। সেই দাবি, ঘটনাস্থলের প্রমাণ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তের অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের পরই দুই মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া সম্ভব হবে।



