কোনও লক্ষণ ছাড়াই বাড়ছে রক্তচাপ! স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন?

উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা অনেক সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই বছরের পর বছর চলতে পারে। নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং স্ট্রোকের সতর্কসংকেত চেনা কেন জরুরি, জেনে নিন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

শরীর সুস্থ, কাজকর্মেও কোনও সমস্যা নেই। মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গও দেখা যাচ্ছে না। তবু অজান্তেই বাড়তে পারে রক্তচাপ। চিকিৎসকদের কাছে উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure) পরিচিত একটি নীরব স্বাস্থ্যসমস্যা, কারণ অনেকের ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। অথচ অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ ধীরে ধীরে ক্ষতি করতে পারে হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক ও কিডনির। বাড়তে পারে স্ট্রোকের ঝুঁকিও। তাই শরীরে অস্বস্তি হওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা জরুরি।

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ সব সময় বোঝা যায় না

ধমনির দেওয়ালে রক্তের চাপ দীর্ঘদিন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। এই অতিরিক্ত চাপ রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে এবং হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অনেকেই মনে করেন, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা কিংবা চোখে ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা না থাকলে রক্তচাপ স্বাভাবিক রয়েছে। বাস্তবে এই ধারণা ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপের নির্দিষ্ট উপসর্গ অনেক সময় থাকে না। ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার সময়েই প্রথম সমস্যাটি ধরা পড়তে পারে।

কখনও রক্তচাপ অত্যন্ত বেড়ে গেলে মাথাব্যথা, দৃষ্টির সমস্যা বা অন্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে শুধু উপসর্গের ভিত্তিতে রক্তচাপের মাত্রা বোঝা সম্ভব নয়। নিয়মিত রক্তচাপ মাপাই ঝুঁকি শনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

উচ্চ রক্তচাপ থেকে কীভাবে বাড়ে স্ট্রোকের আশঙ্কা?

মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হতে পারে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ এই দুই ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকিই বাড়ায়।

এক দিকে, রক্তনালির ক্ষতি এবং ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমার ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রক্ত জমাট বেঁধে কোনও ধমনি বন্ধ হয়ে গেলেও ইসকিমিক স্ট্রোক হতে পারে।

অন্য দিকে, দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ মস্তিষ্কের রক্তনালিকে দুর্বল করে দিতে পারে। সেই রক্তনালি ফেটে গেলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়, যাকে হেমারেজিক স্ট্রোক বলা হয়।

শুধু স্ট্রোক নয়, দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়তে পারে। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

কম বয়সেও হতে পারে উচ্চ রক্তচাপ

উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কম বয়সেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ওজন, শরীরচর্চার অভাব, খাবারে বেশি নুন, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপানের মতো অভ্যাস রক্তচাপ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।

অতিরিক্ত মদ্যপান, পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস এবং কিডনির অসুখও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যার সঙ্গেও উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে।

তাই বয়স কম বলে রক্তচাপ পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে পরিবারের কারও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিংবা জীবনযাপনে একাধিক ঝুঁকির কারণ থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বাড়িতে রক্তচাপ মাপার সময় কী করবেন?

রক্তচাপের সঠিক পরিমাপ পেতে কয়েকটি নিয়ম মেনে চলা জরুরি। মাপার আগে অন্তত পাঁচ মিনিট শান্ত হয়ে বসুন। পিঠ ঠেস দিয়ে বসুন, পা মেঝেতে সমানভাবে রাখুন এবং হাত টেবিলের উপর হৃদ্‌যন্ত্রের উচ্চতায় রাখুন।

রক্তচাপ মাপার অন্তত ৩০ মিনিট আগে ধূমপান, চা-কফি পান এবং শরীরচর্চা এড়িয়ে চলুন। মাপার সময় কথা বলবেন না। প্রথমবার রক্তচাপ বেশি এলে আতঙ্কিত না হয়ে কিছুক্ষণ পরে আবার মাপুন এবং ফলাফল লিখে রাখুন।

একাধিকবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বাড়িতে নিয়মিত মাপার পাশাপাশি অন্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোন অভ্যাস জরুরি?

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জীবনযাত্রার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাবারে নুনের পরিমাণ কমানো, নিয়মিত শাকসবজি ও ফল খাওয়া, শরীরচর্চা করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা উপকারী।

পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান বর্জন এবং মদ্যপান এড়িয়ে চলাও ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেই সবার ক্ষেত্রে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে না। অনেকের নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন হয়।

চিকিৎসক রক্তচাপের ওষুধ দিলে উপসর্গ না থাকলেও নির্ধারিত নিয়মে তা খেতে হবে। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ পরিবর্তন করা উচিত নয়।

স্ট্রোকের এই লক্ষণগুলি দেখলে অপেক্ষা নয়

হঠাৎ মুখের এক দিক বেঁকে যাওয়া, হাত বা পায়ের এক দিকে দুর্বলতা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বুঝতে অসুবিধা কিংবা দৃষ্টিশক্তিতে আকস্মিক পরিবর্তন স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে।

এমন উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে সেরে যাওয়ার অপেক্ষা করবেন না। অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে, সেই সময়টি মনে রাখাও চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখবেন, উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না, তা শুধু শরীরের অনুভূতি দিয়ে বোঝা যায় না। নিয়মিত পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ধারাবাহিকভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাই স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর