ফ্রান্সের বিক্ষোভের সঙ্গে ভারতের ‘ভোটচুরি’ আন্দোলনের যোগ? ফক্স নিউজ়ের রিপোর্ট ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত

ফক্স নিউজ়ের প্রতিবেদনে ফ্রান্স ও ভারতের প্রতিবাদ কর্মসূচির মধ্যে যোগাযোগের দাবি ঘিরে বিজেপি-কংগ্রেস সংঘাত। এসআইআর, ফর্ম ৬ পরিবর্তন এবং ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপট জানুন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) এবং ‘ভোটচুরি’র অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চলা আন্দোলনের সঙ্গে ফ্রান্সের বিক্ষোভের যোগসূত্র রয়েছে—মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ়ের (Fox News) একটি প্রতিবেদনকে সামনে রেখে এমনই দাবি তুলল বিজেপি। বৃহস্পতিবার এই রিপোর্টকে হাতিয়ার করে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ করেছে গেরুয়া শিবির। পাল্টা কংগ্রেসের বক্তব্য, ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে ওঠা প্রশ্ন থেকে নজর ঘোরাতেই বিদেশি যোগের তত্ত্ব সামনে আনা হচ্ছে। তবে ফক্স নিউজ়ের প্রতিবেদনে বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগ ও আন্দোলনের প্রচারের যে দাবি করা হয়েছে, তা থেকেই ভারতের বিক্ষোভে বিদেশি শক্তির পরিচালনা বা ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হয় না।

২০ অক্টোবর প্রকাশিত ফক্স নিউজ়ের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ১৩টি দেশের ১০১টি সংগঠনকে চিহ্নিত করেছে তাদের অনুসন্ধানী দল। সংবাদমাধ্যমটির বক্তব্য, বিভিন্ন দেশের বামপন্থী, সমাজতান্ত্রিক, শ্রমিক, ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলির মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে এবং তারা বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিকে সংগঠিত বা প্রচার করছে। প্রতিবেদনে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পাশাপাশি ভারতের নির্বাচন কমিশনবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গও এসেছে। ফক্স নিউজ়ের মূল প্রতিবেদন-এ এই দাবিগুলি তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ‘ইন্ডিয়ান অ্যালায়েন্স প্যারিস’ (Indian Alliance Paris) নামে ফ্রান্সের একটি সংগঠনের উল্লেখ রয়েছে। ফক্স নিউজ়ের দাবি, ফ্রান্স ও ভারতের তরুণদের আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সংগঠনটি ভূমিকা নিয়েছে। একই সঙ্গে নেভিল রয় সিংহমের (Neville Roy Singham) সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত কয়েকটি সংগঠন এবং ‘প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল’-এর (Progressive International) কথাও বলা হয়েছে। তবে প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রচার, বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগ এবং কোনও আন্দোলনকে বিদেশ থেকে অর্থ দিয়ে পরিচালনা করা—এই তিনটি বিষয় এক নয়। প্রতিবেদনে উল্লিখিত যোগাযোগের ভিত্তিতে ভারতের আন্দোলন বিদেশি অর্থে পরিচালিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

ফক্স নিউজ়ের এই প্রতিবেদনকে সামনে রেখেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্র করেছে বিজেপি। দলের মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া (Gaurav Bhatia) অভিযোগ করেছেন, বিদেশি সংগঠনের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের যোগাযোগ রয়েছে এবং তার মাধ্যমে ভারতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকেও নিশানা করেন তিনি। বিজেপির বক্তব্য, বিদেশি সংগঠনগুলির সঙ্গে বিরোধী নেতাদের যোগাযোগের অভিযোগ জাতীয় রাজনীতিতে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। যদিও এই অভিযোগের সমর্থনে প্রকাশ্যে আসা তথ্য ও প্রমাণের পৃথক যাচাই জরুরি।

বিজেপির অভিযোগের জবাবে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ (Jairam Ramesh) বলেন, নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের সরকার রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং ভোটাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন থেকে নজর সরানোর চেষ্টা করছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ভোটারদের নাম বাদ পড়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার উত্তর না দিয়ে আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়া ও সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এসআইআর বিতর্কের মধ্যেই ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করার ফর্ম ৬ (Form 6)-এর পরিবর্তন নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। ৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের (Chief Justice of India Surya Kant) নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) বেঞ্চ জানায়, ফর্ম ৬-এর কোনও পরিবর্তিত সংস্করণ আদালত অনুমোদন করেনি। পরিবর্তনটি কে করেছিলেন, তা জানতে কমিশনের নথি পরীক্ষা করার কথাও জানায় আদালত। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসআইআর চলাকালীন নতুন ভোটারদের ফর্মে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র যুক্ত করা নিয়ে এই প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ভোটার নথিতে পরিবর্তনের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে, ভারতে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়েও আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশ্ন উঠেছে। ২০ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা এবং প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান ও এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটও বিতর্কের অংশ। রয়টার্সের প্রতিবেদনটি এখানে পড়ুন।

ফলে ফক্স নিউজ়ের রিপোর্ট ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি দুটি পৃথক প্রশ্ন সামনে এসেছে—ভারতের প্রতিবাদ কর্মসূচির সঙ্গে বিদেশি সংগঠনগুলির যোগাযোগের প্রকৃতি কী এবং এসআইআর ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব কীভাবে দেবে নির্বাচন কমিশন। বিজেপি বিদেশি যোগের অভিযোগকে সামনে আনছে, অন্যদিকে কংগ্রেস ভোটাধিকার ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার প্রশ্নে অনড়। তবে কোনও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের উল্লেখকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন যাচাইযোগ্য নথি ও স্বাধীন তদন্ত।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর