শরীরচর্চা, সৌন্দর্যচর্চা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর নামে এখন অনেকেই নিয়মিত ভিটামিন ও মাল্টিভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাচ্ছেন। সমাজমাধ্যমের পরামর্শ, ইউটিউব ভিডিও বা ইন্টারনেটের তথ্য দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এই অভ্যাসই কখনও কখনও ডেকে আনতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে কোনও পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না, তা পরীক্ষা না করেই ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট শুরু করা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন শরীরের উপকারের বদলে ক্ষতিই করতে পারে। কিডনির সমস্যা, লিভারের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদে জটিল রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে এক তরুণীর অভিজ্ঞতা ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ত্বক ভালো রাখতে এবং বয়সের ছাপ কমানোর আশায় তিনি দীর্ঘদিন ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেছিলেন। পরে তাঁর হজমের সমস্যা, চোখের নীচে কালো দাগ এবং কিডনিতে পাথর ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ভিটামিন সি গ্রহণের সঙ্গে এই ধরনের সমস্যার যোগ থাকতে পারে।
গবেষণা কী বলছে?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শরীরে কিছু ভিটামিনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২-এর উচ্চ মাত্রা নিয়ে একাধিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। যদিও চিকিৎসকদের মতে, ভিটামিন বি১২ সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করে এমন প্রমাণ নেই, তবে শরীরে গুরুতর রোগ থাকলে এর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই কারণ না জেনে সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়।
কোন কোন সাপ্লিমেন্ট বেশি খেলে ক্ষতি হতে পারে?
ভিটামিন বি১২:
অতিরিক্ত মাত্রায় দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে তা শরীরে জমা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি লিভার বা অন্যান্য জটিল শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম:
সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার হয় এই দুই সাপ্লিমেন্টের। অতিরিক্ত গ্রহণে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে গিয়ে কিডনিতে পাথর, ডিহাইড্রেশন এবং হৃদ্যন্ত্রের ছন্দের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আয়রন ও ভিটামিন এ:
প্রয়োজনের বেশি আয়রন খেলে পেটের গোলমাল, বমি বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত ভিটামিন এ লিভার, হাড় ও ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। গর্ভাবস্থায় এর ঝুঁকি আরও বেশি।
জিঙ্ক ও বায়োটিন:
অতিরিক্ত জিঙ্ক শরীরে কপারের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। আর বেশি বায়োটিন থাকলে থাইরয়েড, হৃদ্রোগ বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রক্তপরীক্ষার রিপোর্ট ভুল আসতে পারে, যা চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
ভেষজ বা ন্যাচারাল সাপ্লিমেন্ট:
অনেকেই মনে করেন আয়ুর্বেদিক বা হার্বাল সাপ্লিমেন্ট সম্পূর্ণ নিরাপদ। বাস্তবে সব ক্ষেত্রে তা নয়। কিছু ভেষজ উপাদান হার্ট, ডায়াবিটিস বা ক্যানসারের ওষুধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ক্লান্তি, দুর্বলতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে অবশ্যই রক্তপরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেকের শরীরের চাহিদা আলাদা। অন্যের জন্য উপকারী কোনও ভিটামিন আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে।
সুস্থ থাকার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় এখনও সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত শরীরচর্চা। ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তা কখনই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়। স্বাস্থ্য সচেতনতা ভালো, তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অনেক সময় স্বাস্থ্যের জন্যই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।



