নজরবন্দি ব্যুরো: ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনের নিচুতলায় ‘বিচ্যুতি’ এবং অনৈতিক কাজকর্মের অভিযোগ নিয়ে অস্বস্তিতে রাজ্য বিজেপি। এবার দলীয় কর্মী-নেতাদের আদর্শ, শৃঙ্খলা এবং নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে বড়সড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়েছে বিজেপি। ১৬ অগস্ট কলকাতায় রাজ্য ও জেলাস্তরের প্রায় ৩৫০ জন নেতাকে নিয়ে হবে প্রথম পর্বের প্রশিক্ষণ। এরপর তাঁরাই জেলায় জেলায় গিয়ে দলের কর্মীদের ‘ক্লাস’ নেবেন।
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় organisational challenge এখন বিরোধী দল থেকে শাসকদলের ভূমিকায় দ্রুত মানিয়ে নেওয়া। এতদিন আন্দোলন, সরকার-বিরোধী কর্মসূচি এবং বিরোধিতার রাজনীতিতে অভ্যস্ত নেতা-কর্মীদের এবার প্রশাসন ও সরকারের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সমীকরণ বুঝতে হবে। সেই পরিবর্তনই প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে দলীয় সূত্রে খবর।
শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, দলীয় আদর্শ ও শৃঙ্খলা নিয়েও নিচুতলায় বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে বিজেপি। দলের অন্দরে বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘বিচ্যুতি’র অভিযোগ সামনে আসার পরই এই প্রশিক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাজ্য নেতৃত্বের একাধিক নেতা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে কর্মীদের সতর্ক করেছেন।
১৬ অগস্ট বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে বসবে প্রথম প্রশিক্ষণ শিবির। সেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুখ প্রশিক্ষক হিসেবে থাকবেন। শিবপ্রকাশ (Shiv Prakash), সুনীল বনশল (Sunil Bansal), মঙ্গল পাণ্ডে (Mangal Pandey), অমিত মালব্য (Amit Malviya)-সহ একাধিক নেতার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
দলের সর্বভারতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) শিবপ্রকাশ প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলির একটি নেবেন। সংগঠনের ভিতরে শৃঙ্খলা, দলীয় আদর্শ এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কর্মীদের ভূমিকা—এই বিষয়গুলিই তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে পারে বলে সূত্রের খবর।
প্রশিক্ষক তালিকায় থাকছেন রাজ্য বিজেপির নেতারাও। শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya), অমিতাভ চক্রবর্তী (Amitava Chakraborty), জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এবং দীপক বর্মন (Deepak Barman)-এর মতো নেতাদেরও প্রশিক্ষণ পর্বে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই শিবিরে ‘ছাত্র’ হিসেবে থাকবেন প্রায় ৩৫০ জন। তাঁদের মধ্যে থাকছেন বিভিন্ন জেলার সভাপতি ও ইনচার্জ, সংগঠন থেকে বাছাই করা বিধায়ক, রাজ্য মোর্চার সভাপতি এবং রাজ্য কমিটির সদস্যরা। অর্থাৎ, একেবারে শীর্ষস্তর থেকে নিচুতলায় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করছে দল।
প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় ধাপ আরও গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার শিবির শেষে ওই প্রায় ৩৫০ জনকে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হবে। সেখানে তাঁরা জেলা স্তরের নেতা-কর্মীদের দলীয় ইতিহাস, মতাদর্শ, সংগঠনের কাঠামো এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেবেন।
২২ থেকে ৩০ অগস্টের মধ্যে জেলায় জেলায় এই প্রশিক্ষণ শিবির হওয়ার কথা। প্রতিটি শিবিরের মেয়াদ এক রাত, দু’দিন। ফলে রাজ্য স্তরের একটি প্রশিক্ষণকে কয়েক দিনের মধ্যে গোটা সংগঠনের নিচুতলায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বিজেপি।
এই প্রশিক্ষণে বিজেপির রাজনৈতিক ইতিহাসও জায়গা পাবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Syama Prasad Mukherjee)-এর হাত ধরে ভারতীয় জনসংঘের পথচলা, পরবর্তী সময়ে জনসংঘ থেকে বিজেপির উত্থান এবং দলের সাংগঠনিক দর্শন—এই বিষয়গুলি কর্মীদের সামনে তুলে ধরা হবে।
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর নিচুতলায় দলের একাংশের বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজকর্ম এবং ‘তোলা’ সংক্রান্ত অভিযোগও বিজেপির অন্দরে আলোচনায় এসেছে। দলীয় সূত্রের দাবি, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ইতিমধ্যেই প্রায় ২৫০ জনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। যদিও এই সংখ্যার বিষয়ে প্রকাশ্য দলীয় নথি বা বিস্তারিত তালিকা সামনে আসেনি।
ফলে এই প্রশিক্ষণকে শুধুমাত্র রুটিন সাংগঠনিক কর্মসূচি হিসেবে দেখছে না বিজেপি। ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনের চরিত্র, কর্মীদের আচরণ এবং দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে যে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার মোকাবিলায় আদর্শগত প্রশিক্ষণকেই হাতিয়ার করতে চাইছে রাজ্য নেতৃত্ব।
বিরোধী দলের কর্মী থেকে শাসক দলের কর্মী—এই বদলের সঙ্গে সংগঠন কতটা দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে, তার উপরই আগামী দিনে বিজেপির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটা বড় অংশ নির্ভর করবে। তাই ১৬ অগস্টের কলকাতার ‘ক্লাস’ শুধু প্রশিক্ষণ শিবির নয়, ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির সংগঠনকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার পরীক্ষাও হতে চলেছে।



