নজরবন্দি ব্যুরো: তামিলনাড়ুতে থলপতি বিজয়ের তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (TVK)-এর উত্থানকে শুধু একজন তারকার রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখলে ছবির বড় অংশটাই অধরা থেকে যায়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৪ আসনের মধ্যে ১০৮টি জিতে TVK একক বৃহত্তম দল হয়েছে এবং পরে কংগ্রেস, VCK, IUML ও বাম দলগুলির সমর্থনে সরকার গঠন করেছে।
ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের কয়েকটি পরিচিত সূত্র কাজ করেছে—বংশপরম্পরা, জাতপাতের সমীকরণ, ধর্মীয় পরিচয়, পুরনো ভোটব্যাঙ্ক এবং দশকের পর দশক ধরে তৈরি সাংগঠনিক কাঠামো। নেহরু-গান্ধী পরিবার থেকে যাদব, ঠাকরে, পাওয়ার—রাজনীতিতে পরিবারের উত্তরাধিকার নতুন কিছু নয়।
কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ছবির পাশে আর একটি প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। রাজনীতিতে এমন কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, যেগুলির শুরু হয়েছে প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে। কোথাও জনপ্রিয়তার জোরে, কোথাও জনআন্দোলনের মাধ্যমে, কোথাও আবার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়।
তামিলনাড়ুর TVK তার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলির একটি। দীর্ঘ সময় ধরে DMK ও AIADMK-কে ঘিরে থাকা রাজনীতির বাইরে এসে বিজয়ের দল প্রথম নির্বাচনে ১০৮টি আসন জেতে। পরে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে অন্য দলগুলির সমর্থন পেয়ে বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু বিজয়ের তারকাখ্যাতি নয়। একজন জনপ্রিয় অভিনেতার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে কীভাবে একটি নির্বাচনী সংগঠনে রূপান্তর করা যায়, TVK সেই পরীক্ষাটিও সামনে এনেছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নারীকল্যাণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ—এই ধরনের বিষয়কে রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করেছে দলটি।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে তামিলনাড়ু বা ভারতের রাজনীতি থেকে জাতপাত, পরিচয় কিংবা পুরনো রাজনৈতিক আনুগত্য রাতারাতি উধাও হয়ে যাচ্ছে। বরং পরিবর্তনটা অন্য জায়গায়—পুরনো সমীকরণের পাশাপাশি নতুন ভোটারদের জন্য নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হচ্ছে।
এই জায়গাতেই প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ (Jan Suraaj)-এর পরীক্ষাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে দলটি একটি আসনও জিততে পারেনি। কিন্তু সেই ব্যর্থতার পর সংগঠন গুটিয়ে নেওয়ার বদলে প্রশান্ত কিশোর আবার নির্বাচনী ময়দানে নামেন।
বিহারের বাঁকিপুর উপনির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়া ছিল সেই রাজনৈতিক পরীক্ষার পরবর্তী ধাপ। দীর্ঘদিনের BJP শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বাঁকিপুরে লড়াই করে প্রশান্ত কিশোর শেষ পর্যন্ত জয় পান বলে সাম্প্রতিক ফলাফলে উঠে এসেছে। এই জয় জন সুরাজকে ফের জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
অর্থাৎ, নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের সাফল্যের মাপকাঠি সবসময় প্রথম নির্বাচনের ফল নয়। কখনও প্রথম ব্যর্থতার পর সংগঠন কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জন সুরাজের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নটি এখন আরও জোরালো।
তামিলনাড়ুতেই আর একটি পরীক্ষা শুরু করেছেন কে. আন্নামালাই (K. Annamalai)। BJP ছাড়ার পর ২০২৬ সালের ৫ জুন তিনি We The Leaders নামে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি প্রথমে একটি আন্দোলন হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে পারে। ২০৩১ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
আন্নামালাইয়ের উদ্যোগের আর একটি দিক তাৎপর্যপূর্ণ—প্রযুক্তি, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা। অর্থাৎ, নতুন রাজনীতির লড়াই শুধু মিছিল-মিটিং বা নির্বাচনী প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ডিজিটাল যোগাযোগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
এর থেকেও ভিন্ন একটি পরীক্ষা দেখা গেছে ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party)-র ক্ষেত্রে। অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে মে ২০২৬-এ শুরু হওয়া এই উদ্যোগ প্রথমে ছিল মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল প্রচার। পরে সেটিই দ্রুত রাজনৈতিক পরিচয় নিতে শুরু করে এবং বিপুল সংখ্যক তরুণকে আকৃষ্ট করে।
এই উদ্যোগকে প্রচলিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। বরং এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। সমাজমাধ্যমে তৈরি হওয়া ক্ষোভ, ব্যঙ্গ বা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইস্যু কত দ্রুত সংগঠিত জনমতের রূপ নিতে পারে, ককরোচ জনতা পার্টি তার একটি অভিনব উদাহরণ।
এখানেই ভারতের রাজনীতির পরিবর্তিত চরিত্রটি ধরা পড়ে। আগে কোনও রাজনৈতিক শক্তিকে তৈরি করতে বছরের পর বছর মাঠে কাজ করতে হত। এখন সংগঠনের পাশাপাশি ডিজিটাল পরিসরেও জনভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। অবশ্য ডিজিটাল জনপ্রিয়তা যে সরাসরি ভোটে রূপান্তরিত হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। সেটিই নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগগুলির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কারণ নির্বাচনী রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সংগঠন, প্রার্থী, বুথ-স্তরের উপস্থিতি এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের পরীক্ষা। সমাজমাধ্যমে কয়েক লক্ষ অনুসারী থাকা আর নির্বাচনে কয়েক লক্ষ ভোট পাওয়া এক বিষয় নয়। TVK-র ক্ষেত্রে তারকাখ্যাতির সঙ্গে সাংগঠনিক কাঠামো যুক্ত হয়েছে; জন সুরাজের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের প্রচেষ্টার সঙ্গে নির্বাচনী পরীক্ষা যুক্ত হয়েছে।
তাই এই নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগগুলিকে ‘পুরনো রাজনীতির অবসান’ বলে ঘোষণা করা এখনই ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, পুরনো রাজনীতির বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন বদলাচ্ছে। নতুন খেলোয়াড়রা পুরনো ভোটব্যাঙ্ক দখল করার পাশাপাশি নতুন ভোটার, বিশেষত তরুণদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে।
এর পেছনে ভোটারের পরিবর্তিত প্রত্যাশাও কাজ করছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারের কাছে কোনও নেতার পারিবারিক পরিচয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রশাসনের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যতের সুযোগ।
সমাজমাধ্যম এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এখন কোনও রাজনৈতিক নেতা শুধু নির্বাচনের সময় মানুষের সামনে আসেন না। তাঁকে প্রতিদিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিশ্রুতির হিসাব দিতে হয়। ভুল হলে তার প্রতিক্রিয়াও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এর বিপরীত দিকটিও রয়েছে। ডিজিটাল রাজনীতি যেমন নতুন কণ্ঠকে জায়গা করে দিতে পারে, তেমনই বিভ্রান্তিকর তথ্য, অতিরঞ্জিত প্রচার এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিকেও শক্তিশালী করতে পারে। ফলে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে তারা কতটা শক্তিশালী নীতি, সংগঠন এবং গণভিত্তি তৈরি করতে পারে তার উপর।
আগামী দিনে ডিলিমিটেশন (Delimitation)-সহ বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের নির্বাচনী সমীকরণকে আরও বদলে দিতে পারে। ফলে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলির সামনে প্রশ্নটা শুধু নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীকে কীভাবে ঠেকানো হবে, তা নয়। নিজেদের রাজনৈতিক ভাষা, সংগঠন এবং ভোটারের সঙ্গে সম্পর্ককেও কতটা সময়োপযোগী করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
TVK-র উত্থান, জন সুরাজের পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা, আন্নামালাইয়ের নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ কিংবা ককরোচ জনতা পার্টির মতো ডিজিটাল রাজনৈতিক পরীক্ষাকে তাই একই সুতোয় বাঁধা যায়—রাজনীতিতে প্রবেশের পুরনো দরজা ছাড়াও নতুন দরজা তৈরি হচ্ছে।
এই নতুন উদ্যোগগুলির সবাই যে আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে, তা বলার সময় এখনও আসেনি। কেউ ব্যর্থ হতে পারে, কেউ হারিয়ে যেতে পারে, আবার কেউ হয়তো প্রতিষ্ঠিত দলগুলির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু একটি পরিবর্তন ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—ভারতের রাজনীতিতে শুধু পুরনো পরিচয়, বংশপরিচয় বা দীর্ঘদিনের সংগঠন দিয়ে নতুন প্রজন্মকে ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। ভোটার এখন আরও সরাসরি জানতে চাইছে—রাজনীতি তার জীবনে বাস্তবে কী বদল আনতে পারবে? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাই আগামী দিনের রাজনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে।



