অর্ক সানা: রাত পোহালেই ১৫ অগস্ট। স্বাধীনতা দিবসের সকালে দেশের ঘরে ঘরে উঠবে তেরঙ্গা। কেউ পতাকা তুলবেন ছাদে, কেউ বারান্দায়, কেউ আবার হাতে নিয়ে উদ্যাপনে সামিল হবেন। কিন্তু যে জাতীয় পতাকাকে ঘিরে এত আবেগ, তার প্রতিটি রঙের অর্থ কী? মাঝখানের অশোকচক্রই বা কী বোঝায়? আর এই পতাকার নকশা করেছিলেন কে? এই ইতিহাস কতটা জানি আমরা?
ভারতের জাতীয় পতাকা শুধু তিনটি রঙের কাপড় নয়। স্বাধীনতার আন্দোলন, আত্মত্যাগ, সত্য, শান্তি, অগ্রগতি এবং দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তেরঙ্গার দীর্ঘ ইতিহাস। বর্তমান রূপে জাতীয় পতাকাটি গণপরিষদ (Constituent Assembly) ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই গ্রহণ করে।
ভারতের জাতীয় পতাকার নকশার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে নামটি জড়িয়ে আছে, তিনি পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া (Pingali Venkayya)। অন্ধ্রপ্রদেশের এই স্বাধীনতা সংগ্রামী ও পতাকা-নকশাকার ১৯২১ সালে বিজয়ওয়াড়ার তৎকালীন বেজওয়াদা অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধীর সামনে পতাকার একটি নকশা উপস্থাপন করেছিলেন। সেই নকশায় তিনটি রঙের সঙ্গে ছিল চরকা। [এটাও পড়ে নিন: ‘হর ঘর তিরঙ্গা’-র আবেগে ভুল করবেন না! জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আগে জেনে নিন আসল নিয়ম]

তবে আজকের তেরঙ্গা একদিনে তৈরি হয়নি। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতের পতাকার একাধিক রূপ দেখা গিয়েছে। ১৯০৬ সালে কলকাতার পারসি বাগান স্কোয়ারে একটি ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯০৭ সালে ভিকাজি কামা (Bhikaji Cama) বিদেশের মাটিতেও ভারতের স্বাধীনতার বার্তা বহনকারী পতাকা তুলেছিলেন। পরে হোম রুল আন্দোলনের সময়ও পতাকার নতুন রূপ সামনে আসে।
১৯৩১ সালে তেরঙ্গার রঙের বিন্যাস আরও নির্দিষ্ট রূপ পায়। গেরুয়া, সাদা ও সবুজ—এই তিন রঙের সঙ্গে যুক্ত হয় চরকা। তখনও পতাকার রঙকে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবে দেখার বদলে জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতার ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
এরপর আসে ১৯৪৭। স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা নির্ধারণের সময় চরকার পরিবর্তে মাঝের সাদা অংশে স্থান দেওয়া হয় অশোকচক্র (Ashoka Chakra)-কে। ২২ জুলাই ১৯৪৭ গণপরিষদ বর্তমান জাতীয় পতাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। ১৫ অগস্ট স্বাধীনতার পর থেকেই এই পতাকা স্বাধীন ভারতের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে।
এ বার আসা যাক তিনটি রঙের অর্থে। পতাকার উপরের গেরুয়া (Saffron) দেশের শক্তি ও সাহসের প্রতীক। মাঝের সাদা (White) শান্তি ও সত্যের বার্তা বহন করে। আর নীচের সবুজ (Green) দেশের ভূমির উর্বরতা, বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
মাঝের নীল চক্রটির ইতিহাসও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি সারনাথের অশোকস্তম্ভের সিংহমুকুটের ভিত্তিতে থাকা ধর্মচক্র (Dharma Chakra) থেকে নেওয়া। অশোকচক্রে রয়েছে ২৪টি কাঁটা বা spokes। সরকারি ব্যাখ্যায় এই চক্রের ভাবনার সঙ্গে সত্য, জীবন ও গতিশীলতার ধারণা যুক্ত—অর্থাৎ চলমান জীবন ও অগ্রগতির প্রতীক হিসেবেও এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হয়।
জাতীয় পতাকার গঠনেও রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। পতাকাটি আয়তাকার এবং এর দৈর্ঘ্য ও উচ্চতার অনুপাত ৩:২। তিনটি অনুভূমিক অংশ সমান প্রস্থের—উপরে India saffron, মাঝখানে সাদা এবং নীচে India green; সাদা অংশের কেন্দ্রে থাকে নেভি-ব্লু অশোকচক্র।
এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। জাতীয় পতাকা নিয়ে আবেগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তার মর্যাদা রক্ষার নিয়ম জানাও জরুরি। Flag Code of India, 2002 জাতীয় পতাকার প্রদর্শন ও ব্যবহারের বিভিন্ন দিক নির্ধারণ করে এবং সাধারণ নাগরিক, বেসরকারি সংস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তার বিধান রয়েছে।
তাই ১৫ অগস্টের সকালে যখন বাড়ির ছাদে তেরঙ্গা উঠবে, সেটি শুধু স্বাধীনতার উৎসবের মুহূর্ত নয়—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের সংগ্রামের স্মৃতি। পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার নকশা থেকে গণপরিষদের অনুমোদন, চরকা থেকে অশোকচক্র—ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাস আসলে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তেরঙ্গার দিকে তাকিয়ে দেশপ্রেম অনুভব করা সহজ। কিন্তু তার ইতিহাস, প্রতিটি রঙের অর্থ এবং মর্যাদা বোঝার মধ্যেই রয়েছে সেই দেশপ্রেমের গভীরতা।



