অর্ক সানা: স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে লালকেল্লার মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) যখন দেশকে ‘শক্তির সপ্তধারা’-য় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নের কথা বলছেন, ঠিক তখনই সামনে এল এমন একটি ছবি, যা অস্বস্তি তৈরি করার মতো। প্রধানমন্ত্রীর বুকপকেটে থাকা তেরঙ্গা-রঙের প্রতীকটিতে গেরুয়া-সাদা-সবুজের স্বাভাবিক বিন্যাসের বদলে উল্টো রঙের বিন্যাসই চোখে পড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ভুল বলার আগে প্রশ্ন উঠছে, স্বাধীনতা দিবসের মতো দিনে তাঁর পোশাকের প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি যাঁদের দেখার দায়িত্ব, তাঁরা কি একবারও খেয়াল করেননি?
জাতীয় পতাকা কোনও সাধারণ প্রতীক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, শহিদদের আত্মত্যাগ এবং দেশের সার্বভৌম অস্তিত্বের ইতিহাস। পতাকার নির্দিষ্ট রঙের বিন্যাস এবং মর্যাদা নিয়ে ‘Flag Code of India’-তেও স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। তাই দেশের প্রধানমন্ত্রীর পোশাকে তেরঙ্গার প্রতীক থাকলে সেটি নিছক ফ্যাশনের বিষয় হয়ে থাকে না। বিশেষ করে সেই পোশাক যখন স্বাধীনতা দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গোটা দেশের সামনে আসে।
এখানেই অস্বস্তির জায়গাটা আরও বড়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই বারবার জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার কথা বলেন। তাঁর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণেও দেশ, আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় শক্তির উপর জোর ছিল। অথচ সেই ভাষণের দিনেই তাঁর বুকপকেটের তেরঙ্গা-রঙের প্রতীক যদি সত্যিই উল্টো বিন্যাসে থাকে, তাহলে তা নজরে পড়া স্বাভাবিক।

এটিকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাকৃত কাজ বলা যায় না। বরং দায়টা বেশি করে তাঁদের উপর বর্তায়, যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর পোশাক, ল্যাপেল পিন বা অন্যান্য প্রতীকী উপকরণ প্রস্তুত ও সাজানোর দায়িত্বে ছিলেন। কারণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে থাকা একজন ব্যক্তির পোশাকেও প্রতিটি প্রতীকের আলাদা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্থ তৈরি হয়।
স্বাধীনতা দিবসের মতো দিনে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। লালকেল্লার প্রাচীর থেকে প্রধানমন্ত্রী যখন জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে দেশকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তখন তাঁর বুকপকেটের তেরঙ্গা নিয়েই যদি প্রশ্ন ওঠে, তা নিছক একটি পোশাকগত ত্রুটি হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। ভুল যদি অনিচ্ছাকৃতও হয়, জাতীয় প্রতীকের ক্ষেত্রে সেই অসতর্কতার জায়গা কতটা থাকা উচিত—প্রশ্নটা সেখানেই।
আর এই বিতর্কের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে তুলে ধরেছেন ‘শক্তির সপ্তধারা’। ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যে উৎপাদন, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, যোগাযোগ ও পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা, গ্রিন ও ব্লু ইকোনমি এবং ভারতের সফ্ট পাওয়ারকে সামনে রেখে উন্নয়নের নতুন রূপরেখা দিয়েছেন তিনি।
উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতকে শুধু বিশ্বের বড় বাজার নয়, বিশ্বের সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য জানিয়েছেন মোদী। ‘Made in India’ পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে মূল্য সংযোজনের উপর জোর দিয়েছেন তিনি।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বড় স্বপ্নের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, রোবোটিক্স এবং ৬জি-র মতো ক্ষেত্রে ভারতকে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন। দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার কথাও উঠে এসেছে তাঁর ভাষণে।
ভারতের সফ্ট পাওয়ার নিয়েও প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। যোগ, আয়ুর্বেদ, সংস্কৃতি, হস্তশিল্প, সিনেমা, অ্যানিমেশন, গেমিং এবং ডিজিটাল কনটেন্টকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
২০২২ সালের স্বাধীনতা দিবসে ‘পঞ্চপ্রাণ’-এর কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। চার বছর পর সামনে এল ‘শক্তির সপ্তধারা’। অর্থাৎ ২০৪৭-এর বিকশিত ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরাই ছিল এ দিনের ভাষণের মূল উদ্দেশ্য।
কিন্তু সেই বড় রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি স্বাধীনতা দিবসের ছবিতে ছোট্ট একটি প্রতীকই এখন বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী ভুল করতে পারেন, তাঁর পোশাকের দায়িত্বে থাকা মানুষও ভুল করতে পারেন। কিন্তু জাতীয় পতাকার ক্ষেত্রে ভুলের জায়গাটা কি একটু বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিল না?
কখনও কখনও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি খুব ছোট একটি ছবির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। এই ছবিটিও তেমনই। প্রধানমন্ত্রী নন, দল নয়, সরকার নয়—দেশ সবার আগে। জাতীয় পতাকার মর্যাদা সবার উপরে। তাই কেউ যদি সত্যিই বলতে না পারে, ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’, অন্তত নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা উচিত—তেরঙ্গার ক্ষেত্রে এত বড় অসতর্কতা কী করে চোখ এড়িয়ে গেল?



