বদলের বাংলায় স্বাধীনতা দিবসের সকালে অন্যরকম ছবি ধরা পড়ল কলকাতার রেড রোডে। জাতীয় গানের আবহ, কুচকাওয়াজ, একের পর এক বর্ণময় ট্যাবলো এবং কড়া নিরাপত্তায় জমজমাট হয়ে উঠল রাজ্য সরকারের মূল স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর (Netaji Subhas Chandra Bose) মূর্তিতে মাল্যদান করে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য এদিন ১৪ জন আইপিএস আধিকারিককে দেওয়া হয় ‘মুখ্যমন্ত্রীর পদক’।
অনুষ্ঠানের আগে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে রাজ্যবাসীকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানান মুখ্যমন্ত্রী। এরপর রেড রোডের মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে নেতাজির মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানান তিনি। পতাকা উত্তোলনের পর শুরু হয় আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি। গোটা অনুষ্ঠানজুড়েই দেশাত্মবোধের আবহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
এবারের রেড রোডের কুচকাওয়াজে ছিল বিশেষ চমকও। প্রথমবার কম্যান্ডারের পাশাপাশি সহকারী কম্যান্ডারকে নিয়ে প্যারেড পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। কুচকাওয়াজ শেষ হওয়ার পর একে একে মোট ১২টি ট্যাবলো প্রদর্শিত হয়। রাজ্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের নানা দিক তুলে ধরা হয় এই ট্যাবলোগুলির মাধ্যমে।
এর মধ্যে বিশেষ নজর কাড়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Syama Prasad Mukherjee) ট্যাবলো। তাঁর জীবন ও অবদানের বিভিন্ন দিককে সামনে রেখে সাজানো হয় এই বিশেষ প্রদর্শনী। পাশাপাশি অন্নামৃত, কন্যারত্ন এবং অন্নপূর্ণা যোজনার মতো সরকারি প্রকল্পও ট্যাবলোর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য ও নারীশক্তির বিষয়ও জায়গা করে নেয় রেড রোডের ট্যাবলোয়। আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির, দুর্গাশক্তি বাহিনী, কলকাতা পুলিশ এবং কলকাতা পুরসভার ট্যাবলোও কুচকাওয়াজের পর দর্শকদের সামনে আসে। ফলে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান শুধু সামরিক কুচকাওয়াজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের প্রদর্শনও হয়ে উঠেছে অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।
এদিন রেড রোডের নিরাপত্তাতেও ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। প্রথমবারের মতো রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। কলকাতা শহরজুড়ে প্রায় তিন হাজার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রেড রোডকে মোট ১৩টি জোনে ভাগ করে নিরাপত্তার দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছিল।
প্রতিটি জোনের দায়িত্বে ছিলেন ডিসি পদমর্যাদার একজন করে পুলিশ আধিকারিক। ১৩টি জোনের অধীনে মোট ৮০টি সেক্টর করা হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছিলেন অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, ২০ জন ডিসি এবং ৪০ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার আধিকারিক।
শুধু রেড রোড নয়, গোটা কলকাতা শহরজুড়েই বাড়ানো হয়েছিল নজরদারি। টহলের জন্য মোতায়েন ছিল ন’টি পিসিআর ভ্যান এবং তিনটি কুইক রেসপন্স টিম। শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ১৯টি পুলিশ পিকেট বসানো হয়। মেট্রো স্টেশনগুলিতে ছিল ২৫টি পিকেট। বাজার ও শপিং মলগুলিতেও ২৪টি অতিরিক্ত পিকেটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ধর্মীয় স্থানগুলির নিরাপত্তাতেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়। কালীঘাট মন্দিরের পাশাপাশি শহরের আরও সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মস্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। শহরের ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় নাকা চেকিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। অনুষ্ঠানস্থলে কোনওরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা নাশকতা ঠেকাতে দর্শকদের ভিড়ের মধ্যেও সাদা পোশাকে পুলিশকর্মীদের মোতায়েন রাখা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে দেশাত্মবোধ, কুচকাওয়াজ, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্মরণ এবং সরকারি প্রকল্পের প্রদর্শন—সবকিছুর মেলবন্ধনে রেড রোডের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হয়ে উঠল নজরকাড়া। ‘বন্দে মাতরম’-এর সুর থেকে শ্যামাপ্রসাদের ট্যাবলো, আর তার সঙ্গে নজিরবিহীন নিরাপত্তা—এদিনের আয়োজনেই একসঙ্গে ধরা পড়ল ইতিহাস, প্রশাসন ও নতুন বাংলার বার্তা।



