সরকার পরিবর্তনের পর কলকাতার রেড রোডে প্রথম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূর্তিতে মাল্যদান ও পুলিশ মেমোরিয়ালে শ্রদ্ধা জানানোর পর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল কর্মসংস্থান, নারী সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা এবং ‘বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ’ গড়ে তোলা।
রেড রোডের মঞ্চ থেকে রাজ্যবাসীকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) বলেন, এই গর্বের দিনে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত বীর সেনা, আধা সামরিক বাহিনী, কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, এনসিসি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। রাজ্যের মানুষের উদ্দেশেও তাঁর বার্তা ছিল ঐক্য ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্য। তাঁর কথায়, ভারতকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে পশ্চিমবঙ্গকেও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। সেই লক্ষ্যেই তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় কর্মসংস্থান, নারী সুরক্ষা এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলি রয়েছে।
শুভেন্দুর বক্তব্যে উঠে আসে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসও। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও স্বামী প্রণবানন্দের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে পশ্চিমবঙ্গ একসময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলির মধ্যে ছিল, সেই জায়গা ফেরানোর লক্ষ্য নিয়েই তাঁর সরকার কাজ করতে চায়।
উন্নয়নের পরিধি কলকাতা বা শহরাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না বলেও স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে পাহাড় থেকে সাগর, জঙ্গলমহল থেকে তরাই-ডুয়ার্স—রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়ার কথা উঠে আসে। আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রেখে পরিকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তাও দেন তিনি।
গত ৯ মে ব্রিগেড ময়দানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে শপথ নেওয়ার প্রসঙ্গও টেনে আনেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, সংবিধানকে সামনে রেখেই সরকার পরিচালিত হবে এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করা হবে। রাজনৈতিক বিভাজন সরিয়ে রাজ্যের উন্নয়নে সকলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে জাতীয়তাবাদ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসও বিশেষ জায়গা পায়। ক্ষুদিরাম বসুর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মাটির সঙ্গে রাষ্ট্রবাদ ও আত্মত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ‘বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ’ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।
এদিন রেড রোডের অনুষ্ঠান শুধু ভাষণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মার্চ পাস্টের পর একে একে প্রদর্শিত হয় একাধিক ট্যাবলো। সেখানে রাজ্যের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচির ছবি তুলে ধরা হয়।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে তৈরি ট্যাবলোর পাশাপাশি পিএম পোষণ, অন্নপূর্ণা যোজনা, বেটি বচাও বেটি পড়াও, আয়ুষ্মান ভারত, টিবি মুক্ত ভারত অভিযান এবং বিকশিত ভারত–G-RAM-G-এর মতো বিষয়ও প্রদর্শিত হয়।
এর পাশাপাশি বিষ্ণুপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ‘Safe & Secure West Bengal’, সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে সচেতনতা, মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে সরকারি বাস পরিষেবা, সড়ক নিরাপত্তা এবং প্রধানমন্ত্রী সূর্য ঘর প্রকল্পও ট্যাবলোর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
ফলে এবারের রেড রোডের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে একদিকে যেমন স্বাধীনতা সংগ্রাম, বাংলার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ছবি ধরা পড়েছে, অন্যদিকে সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণের বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ট্যাবলো প্রদর্শন—দুই ক্ষেত্রেই মূল বার্তা ছিল কর্মসংস্থান, নারী সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা এবং উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তোলা।



