স্বাধীনতা দিবসের দিনই উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে বড়সড় সাফল্য বেঙ্গল এসটিএফের। দিনহাটার সাহেবগঞ্জ এলাকা থেকে পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। ধৃতদের নাম রশিদুল হক, নুর নাসিরুদ্দিন আলি এবং সফিকুল ইসলাম। তাঁদের জেরা করে বাংলায় পাকিস্তানি গুপ্তচরচক্রের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, তারই খোঁজ চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা।
বেঙ্গল এসটিএফ (Bengal STF) সূত্রে খবর, ধৃত তিনজনের বিরুদ্ধে ভারতীয় মোবাইল সিম কার্ড সংগ্রহ করে তা বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, বাংলাদেশ হয়ে সেই সিম কার্ড পাকিস্তানে পৌঁছত। গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁদের কী ধরনের যোগাযোগ ছিল, কার নির্দেশে এই কাজ চলত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুধু সিম কার্ড পাচারের অভিযোগ নয়, ধৃত তিনজনের বিরুদ্ধে জাল নোটের কারবারের সঙ্গেও যুক্ত থাকার সন্দেহ রয়েছে। তদন্তকারীরা তাঁদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছেন। এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত কি না, কিংবা সীমান্তের ওপারে কোনও নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না, এখন সেটাই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কোচবিহারের এই গ্রেপ্তারির সময়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতা দিবসের দিন যখন গোটা রাজ্যজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঠিক তখনই সীমান্তবর্তী উত্তরবঙ্গে একসঙ্গে তিনজনকে পাক গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেপ্তারের খবর সামনে এল। ফলে তাঁদের কার্যকলাপের সঙ্গে কোনও নাশকতার পরিকল্পনার যোগ ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা। তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও পরিকল্পনার বিষয় নিশ্চিত করেনি তদন্তকারী সংস্থা।
এর আগে চলতি সপ্তাহেই উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া থেকে পাক গুপ্তচর সন্দেহে রানা রউফকে গ্রেপ্তার করেছিল বেঙ্গল এসটিএফ। তদন্তে উঠে আসে, পাকিস্তানের ফয়সলাবাদের বাসিন্দা রানা ভারতে নিজের পরিচয় গোপন করে বসবাস করছিলেন বলে অভিযোগ। কলকাতার তপসিয়া এলাকায় ভাড়াবাড়িতে থাকার পাশাপাশি তাঁর কাছে ভুয়ো আধার ও ভোটার কার্ড থাকার কথাও সামনে আসে।
রানা রউফকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর এক সহযোগীকেও আটক করা হয়েছিল। তদন্তকারীরা তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এ দেশে তাঁদের যোগাযোগ এবং কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। রানা রউফের কাছ থেকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের ছবি ও মানচিত্র উদ্ধারের খবরও প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
রানা রউফের গ্রেপ্তারির কয়েক দিনের মধ্যেই কোচবিহারে তিনজনকে পাক গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেপ্তারির ঘটনা তদন্তের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিল। উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, বাংলাদেশ সীমান্তের নৈকট্য এবং সিম কার্ড পাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে তদন্তকারীদের নজর এখন এই নেটওয়ার্কের পরবর্তী স্তরের দিকে।
এখানেই শেষ নয়। গত মাসের শেষদিকে পূর্ব বর্ধমান থেকেও পাক যোগের সন্দেহে হামিম মণ্ডল নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছিল বেঙ্গল এসটিএফ। তাঁর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সঙ্গে যোগাযোগ এবং নাশকতার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হাওড়ার পিলখানা এলাকায় থাকার সময় তাঁর কর্মকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে বর্ধমানে বসবাসের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।
তদন্তকারীদের মতে, এই একের পর এক গ্রেপ্তারির পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলায় পাকিস্তানি গুপ্তচরচক্রের নেটওয়ার্কের প্রকৃত বিস্তার। কোচবিহারের তিন ধৃত, হাবড়ার রানা রউফ এবং বর্ধমানের হামিম মণ্ডলের ঘটনাগুলির মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, থাকলে সেই যোগ কতটা গভীর—জেরার পরেই তার ছবি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
এই মুহূর্তে তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিষয়—ভারতীয় সিম কার্ড কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছিল, সেখান থেকে তার গন্তব্য পাকিস্তান কি না এবং জাল নোটের কারবারের সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের কোনও যোগাযোগ রয়েছে কি না। পাশাপাশি, বাংলার মাটিতে এই চক্রের আরও কোনও সদস্য সক্রিয় রয়েছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে কোচবিহারের এই তিন গ্রেপ্তারি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বড় কোনও গুপ্তচর নেটওয়ার্কের সূত্র—আগামী দিনের তদন্তেই তার উত্তর মিলবে।



