অর্ক সানা: প্রতি বছর ১৫ অগস্ট সকালে যখন আকাশে তেরঙ্গা উড়তে দেখি, তখন আমাদের চোখে ভেসে ওঠে স্বাধীন ভারতের গর্ব। কিন্তু সেই পতাকার নকশার সঙ্গে যে মানুষটির নাম সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে, তাঁর জীবন ছিল একেবারেই অন্যরকম। পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া (Pingali Venkayya)—স্বাধীনতা সংগ্রামী, পতাকা-অনুরাগী এবং ভারতের জাতীয় পতাকার প্রাথমিক নকশার অন্যতম প্রধান কারিগর—জীবনের শেষদিকে প্রায় বিস্মৃত হয়েই ছিলেন। ভারত সরকারের Azadi Ka Amrit Mahotsav উদ্যোগেও তাঁকে জাতীয় তেরঙ্গার নকশাকার হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার জন্ম ১৮৭৬ সালের ২ অগস্ট, অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণা জেলার ভাটলাপেনুমারু (Bhatlapenumarru) গ্রামে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্বিতীয় বোয়ার যুদ্ধের (Second Boer War) সময় কাজ করেন। সেখানেই মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। যুদ্ধের সময় ভারতীয় সৈন্যদের ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাককে স্যালুট করতে হত—এই অভিজ্ঞতাই তাঁর মনে ভারতের নিজস্ব জাতীয় পতাকার প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর করে তোলে।
তবে জাতীয় পতাকা নিয়ে তাঁর ভাবনা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ১৯০৬ সালের কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পর পতাকা নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও প্রবল হয়। এরপর বহু বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পতাকা নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন এবং ভারতের জন্য একটি স্বতন্ত্র পতাকার নকশা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যান। ১৯১৬ সালে প্রকাশ করেন ‘A National Flag for India’ নামে একটি পুস্তিকা, যেখানে একাধিক সম্ভাব্য পতাকার নকশা তুলে ধরা হয়েছিল।
তারপর আসে ১৯২১ সাল। বিজয়ওয়াড়ায় (তৎকালীন বেজওয়াড়া) কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ফের দেখা হয়। ভারতের জন্য একটি জাতীয় পতাকার প্রয়োজনীয়তার কথা ভেঙ্কাইয়া দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন। গান্ধী তাঁকে একটি নতুন পতাকার নকশা তৈরি করতে বলেন। ভেঙ্কাইয়া একটি নকশা তৈরি করেন, যাতে লাল ও সবুজ রঙের পাশাপাশি চরকার উপস্থিতি ছিল। গান্ধীর পরামর্শে পরে সাদা রঙের একটি অংশও যুক্ত হয়।
এই পর্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১৯২১ সালের সেই পতাকাই আজকের জাতীয় পতাকার হুবহু রূপ ছিল না। সেটি ছিল পরবর্তী তেরঙ্গার বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ১৯৩১ সালে পতাকার নকশায় আরও পরিবর্তন আসে এবং গেরুয়া, সাদা ও সবুজের বিন্যাস জনপ্রিয়তা পায়। মাঝখানে তখনও ছিল চরকা।
স্বাধীনতার ঠিক আগে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই গণপরিষদ (Constituent Assembly) বর্তমান জাতীয় পতাকাকে গ্রহণ করে। চরকার পরিবর্তে সাদা অংশের মাঝখানে জায়গা পায় নেভি-ব্লু অশোকচক্র। ফলে ভেঙ্কাইয়ার প্রাথমিক নকশা সরাসরি বর্তমান পতাকা হয়ে ওঠেনি; বরং তাঁর উদ্যোগ ও নকশা-ভাবনা পরবর্তী জাতীয় পতাকার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল।
এই কারণেই তাঁকে শুধু ‘জাতীয় পতাকার ডিজাইনার’ বললে পুরো ইতিহাসটি হয়তো ধরা পড়ে না। আরও নির্ভুলভাবে বললে, ভারতের জাতীয় পতাকার প্রাথমিক নকশার অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক ছিলেন পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া। বর্তমান তেরঙ্গা গণপরিষদের অনুমোদিত চূড়ান্ত রূপ, কিন্তু তার পেছনে কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং বহু মানুষের অবদান রয়েছে।
আর এখানেই ভেঙ্কাইয়ার জীবনের গল্পে আসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। যে মানুষটি ভারতের জন্য একটি স্বতন্ত্র জাতীয় প্রতীকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করেছিলেন, স্বাধীনতার পরে তাঁর নাম তেমনভাবে জাতীয় স্মৃতিতে জায়গা করে নিতে পারেনি। ১৯৬৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। সরকারি স্মরণপত্রেও উল্লেখ রয়েছে যে তাঁর জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান দীর্ঘদিন যথেষ্টভাবে নথিবদ্ধ হয়নি।
তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করার ক্ষেত্রে অনেক দেরি হয়েছিল। ২০০৯ সালে তাঁর সম্মানে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। তাঁর অবদানকে ঘিরে পরবর্তীকালে স্মরণসভা, মূর্তি ও বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগও হয়েছে। তবে জাতীয় পতাকার মতো প্রতিদিনের একটি প্রতীকের সঙ্গে যে নামটি জড়িয়ে আছে, সেই নামটি সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পরিচিত—সেটিই আজও বড় প্রশ্ন।
১৫ অগস্টে আমরা যখন তেরঙ্গার সামনে দাঁড়াই, তখন শুধু স্বাধীনতার ইতিহাস নয়, সেই পতাকাকে তৈরি করার দীর্ঘ যাত্রাটিও মনে রাখা দরকার। পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার স্বপ্ন ছিল ভারতের নিজস্ব একটি পতাকা; আজ সেই তেরঙ্গাই বিশ্বের সামনে স্বাধীন ভারতের পরিচয় বহন করে।
তেরঙ্গা তাই শুধু একটি পতাকা নয়। তার প্রতিটি ভাঁজের মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্ন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, নকশার বিবর্তন এবং এমন বহু মানুষের গল্প—যাঁদের নাম হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পাতায় লেখা নেই। এই ১৫ অগস্টে পতাকা তোলার সময় তাঁদের একজন, পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়াকেও মনে রাখা হোক।



