অর্ক সানা: স্বাধীনতা দিবস এলেই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ইতিহাস নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। ভারতের অতীতকে কীভাবে দেখা হবে, কোন অধ্যায়কে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে—এই প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু দিল্লির লাল কেল্লার ক্ষেত্রে একটি বিষয় নিয়ে বিতর্কের অবকাশ খুব কম: এই দুর্গ ভারতের ইতিহাসের একাধিক যুগের সাক্ষী এবং তার নির্মাণের সঙ্গে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের (Shah Jahan)-এর নাম সরাসরি যুক্ত।
আজ যে লাল কেল্লার প্রাচীর থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন, সেই দুর্গের ইতিহাস শুরু হয়েছিল স্বাধীন ভারতের বহু আগে। শাহজাহানাবাদকে নতুন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই শাহজাহান লাল কেল্লা নির্মাণের নির্দেশ দেন। UNESCO-ও লাল কেল্লাকে শাহজাহানের নতুন রাজধানী শাহজাহানাবাদের palace-fort হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ১৬৩৯ সালে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৬৪৮ সালে দুর্গের নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। অর্থাৎ, আজকের স্বাধীনতা দিবসের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হওয়া এই স্থাপত্যের মূল শিকড় সপ্তদশ শতকের মুঘল ভারতে। UNESCO-র মূল্যায়নেও লাল কেল্লার স্থাপত্যে পারস্য, তিমুরীয়, ইসলামি এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। লাল কেল্লাকে শুধুমাত্র ‘মুঘল স্থাপত্য’ বললে যেমন তার পরবর্তী ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তেমনই তার মুঘল পরিচয় অস্বীকার করলেও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাদ পড়ে যায়। একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যের পরিচয় তার নির্মাতার সময়কাল দিয়ে শুরু হতে পারে, কিন্তু তার অর্থ ও গুরুত্ব বহু প্রজন্মের ব্যবহারে বদলাতে থাকে।
শাহজাহানের আমলে লাল কেল্লা ছিল রাজশক্তির কেন্দ্র। এটি ছিল মুঘল সম্রাটদের আবাস এবং শাহজাহানাবাদ নগরের কেন্দ্রবিন্দু। দুর্গের প্রাসাদ-অংশে ছিল একের পর এক রাজকীয় কক্ষ, বাগান এবং জলপ্রবাহের ব্যবস্থা। UNESCO-র ভাষায়, লাল কেল্লার পরিকল্পনা ও স্থাপত্য পরবর্তী সময়ে দিল্লি, আগ্রা, রাজস্থান-সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের স্থাপত্যকে প্রভাবিত করেছিল।
কিন্তু লাল কেল্লার ইতিহাস শুধু শাহজাহানেই থেমে থাকেনি। তাঁর উত্তরসূরি ঔরঙ্গজেব (Aurangzeb) দুর্গের পরিসরে মতি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং দুর্গের প্রতিরক্ষা ও প্রবেশ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। পরবর্তী শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক শক্তি কমতে থাকলে লাল কেল্লাও ক্ষমতার পালাবদলের সাক্ষী হয়ে ওঠে।
১৭৩৯ সালে পারস্যের শাসক নাদির শাহ (Nader Shah) দিল্লি আক্রমণ করেন। সেই সময় লাল কেল্লা লুণ্ঠিত হয় এবং মুঘল দরবারের বিপুল সম্পদের একটি অংশ নিয়ে যাওয়া হয়। ময়ূর সিংহাসনের মতো ঐতিহাসিক সম্পদও এই লুণ্ঠনের সঙ্গে যুক্ত। এরপর অষ্টাদশ শতকে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুঘল, মারাঠা, আফগান, জাট ও শিখ শক্তির মধ্যে নানা পালাবদল ঘটে।
এই পর্যায়টি মনে রাখা জরুরি, কারণ লাল কেল্লা কোনও একটি শাসকগোষ্ঠীর হাতে চিরকাল একইভাবে ছিল না। বরং এটি হয়ে উঠেছিল উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক। ১৭৫২ সালের চুক্তির পর মারাঠারা দিল্লির মুঘল সিংহাসনের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮শ শতকের বিভিন্ন সংঘর্ষে লাল কেল্লার নিয়ন্ত্রণও বারবার বদলেছে।
এরপর আসে ব্রিটিশ অধ্যায়। ১৮০৩ সালের দিল্লির যুদ্ধে মারাঠাদের পরাজয়ের পর লাল কেল্লার ওপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্গে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। পরে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ লাল কেল্লার ইতিহাসকে আরও গুরুত্বপূর্ণ মোড় দেয়। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর (Bahadur Shah Zafar) বিদ্রোহের প্রতীকী নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হন।
১৮৫৭-র পর ব্রিটিশরা লাল কেল্লার অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয় এবং সামরিক ব্যারাক নির্মাণ করা হয়। সরকারি নথিতেও বলা হয়েছে, ১৮৫৭-এর পর দুর্গের বহু পুরনো ভবন সরিয়ে ব্রিটিশ সামরিক ব্যবহারের উপযোগী নির্মাণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, আজকের লাল কেল্লার চেহারাও সম্পূর্ণ সপ্তদশ শতকের নয়; এর মধ্যে ঔপনিবেশিক ইতিহাসেরও দৃশ্যমান ছাপ রয়েছে।
তারপর আসে সেই অধ্যায়, যা লাল কেল্লাকে মুঘল রাজপ্রাসাদ থেকে স্বাধীন ভারতের জাতীয় প্রতীকে রূপান্তরিত করে। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু (Jawaharlal Nehru) লাল কেল্লার লাহোরি গেটের উপর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সেই ঘটনার পর থেকেই স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর লাল কেল্লা থেকে পতাকা উত্তোলন এবং জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঐতিহ্য চলে আসছে।
এই ধারাবাহিকতাই লাল কেল্লাকে অনন্য করে। যে দুর্গ একসময় মুঘল সম্রাটের রাজপ্রাসাদ ছিল, যে স্থাপত্য ব্রিটিশ সামরিক দখল ও ধ্বংসের সাক্ষী, সেই একই জায়গা স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। UNESCO-ও বলেছে, লাল কেল্লা মুঘল শাসন থেকে ব্রিটিশ শাসনে ভারতের ইতিহাসের পরিবর্তনের সাক্ষী এবং স্বাধীনতা উদ্যাপনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
তাই ‘মুঘল যুগ ভারতের ইতিহাসের অংশ কি না’—এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় হতে পারে না। ইতিহাসে কোনও যুগকে ভালোবাসা বা অপছন্দ করা ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক অবস্থান হতে পারে; কিন্তু সেই যুগের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা আর ইতিহাসের সমালোচনা করা এক জিনিস নয়।
লাল কেল্লার ক্ষেত্রেই তার প্রমাণ সবচেয়ে স্পষ্ট। তার লাল বেলেপাথরের প্রাচীর শাহজাহানের সময়ের কথা বলে, তার ধ্বংসস্তূপ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার কথা বলে, ১৮৫৭-এর স্মৃতি ভারতীয় প্রতিরোধের কথা বলে এবং লাহোরি গেটের ওপর উড়তে থাকা তেরঙ্গা স্বাধীন ভারতের কথা বলে। একই স্থাপত্যে এতগুলি ইতিহাস পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
আর সেই কারণেই লাল কেল্লার ইতিহাসকে কোনও একটি রাজনৈতিক বয়ানে আটকে রাখা যায় না। মুঘল যুগকে বাদ দিলে তার নির্মাণের ইতিহাস অসম্পূর্ণ হবে, ব্রিটিশ অধ্যায় বাদ দিলে তার ঔপনিবেশিক অতীত অদৃশ্য হবে, ১৮৫৭ বাদ দিলে স্বাধীনতার সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হারিয়ে যাবে এবং ১৯৪৭ বাদ দিলে তার বর্তমান জাতীয় প্রতীকের অর্থই বোঝা যাবে না।
ইতিহাসকে মুছে ফেলার বদলে ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়কে তার সময়, প্রেক্ষাপট এবং সত্যের ভিত্তিতে পড়াই একটি পরিণত সমাজের দায়িত্ব। লাল কেল্লা সেই শিক্ষাটিই যেন প্রতি বছর ১৫ অগস্টে আরও একবার মনে করিয়ে দেয়—একটি দেশের ইতিহাস এক রঙের নয়; বহু শতাব্দীর বহু স্তর মিলেই তার বর্তমান পরিচয় তৈরি হয়।



