১৫ অগস্ট কোথায় ঘুরবেন? কলকাতার কাছেই স্বাধীনতার ইতিহাস জড়িয়ে ৫ অসাধারণ ঠিকানা

১৫ অগস্টের ছুটিতে দূরে নয়, কলকাতা ও আশপাশেই ঘুরে দেখা যায় স্বাধীনতার ইতিহাস। মাতঙ্গিনী হাজরা থেকে নেতাজি, অরবিন্দ ও শরৎচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত ৫ ঠিকানা

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: ১৫ অগস্ট মানেই শুধু জাতীয় পতাকা, কুচকাওয়াজ আর ছুটির দিন নয়। স্বাধীনতা দিবসের ছুটিতে যদি এমন কোথাও যেতে চান, যেখানে বেড়ানোর পাশাপাশি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখা যায়, তা হলে কলকাতা ও আশপাশেই রয়েছে একাধিক জায়গা। মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতিধন্য তমলুক থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাড়ি, অরবিন্দ ভবন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত সামতাবেড় এবং আলিপুর জেল মিউজ়িয়াম—একদিনের সফরে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য পাঁচটি জায়গা রাখতে পারেন তালিকায়।

স্বাধীনতা দিবসের ছুটিতে এই সফরগুলির বিশেষত্ব হল, এগুলির কোনওটিই শুধুমাত্র পর্যটনকেন্দ্র নয়। কোথাও রয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ স্মৃতি, কোথাও বিপ্লবীদের জীবনযাপনের চিহ্ন, আবার কোথাও সাহিত্য ও জাতীয়তাবাদী চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফলে পরিবার নিয়ে বেরোলেও ছোটদের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসকে বইয়ের বাইরে গিয়ে বোঝার সুযোগ।

১. তমলুক: মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতির পথে

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এখানেই জন্মেছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরা (Matangini Hazra)। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তমলুকের থানা ও আদালত দখলের অভিযানে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। তাঁর জন্মস্থান হোগলা গ্রাম এবং শ্বশুরবাড়ি আলিনান গ্রামে আজও তাঁর স্মৃতি ধরে রাখা হয়েছে।

হোগলায় রয়েছে মাতঙ্গিনীর স্মৃতি কুটির। আলিনানে রয়েছে তাঁর স্মৃতিতে তৈরি সংগ্রহশালা। তমলুক থেকে এই এলাকাগুলির দূরত্ব খুব বেশি নয়। স্বাধীনতা দিবসে সেখানে গেলে বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এই অঞ্চলের ইতিহাসকে অন্যভাবে অনুভব করা যায়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gandhi) মাতঙ্গিনীকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন; সেই সফরের স্মৃতিও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

তমলুক শহরে শুধু মাতঙ্গিনীর স্মৃতিই নয়, আরও কিছু জায়গা ঘুরে দেখা যায়। প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত তমলুক রাজবাড়ি, শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ, মিউজ়িয়াম এবং বর্গভীমা মন্দির ঘুরে নিতে পারেন। সময় থাকলে রূপনারায়ণ নদীর পাড়েও কিছুটা সময় কাটানো যায়।

কলকাতা থেকে সড়কপথে তমলুক যাওয়া যায়। হাওড়া থেকে ট্রেনে তমলুক পৌঁছনোর বিকল্পও রয়েছে। শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা ঘুরতে টোটো বা অটো ব্যবহার করা সুবিধাজনক।

২. নেতাজির বাড়ি: কলকাতা থেকে সুভাষগ্রাম, ইতিহাসের দুই ঠিকানা

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Subhas Chandra Bose)-কে ঘিরে কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঠিকানা হল এলগিন রোডের বাড়ি। ৩৮/২ এলগিন রোডের এই বাড়ি থেকেই একসময় ব্রিটিশ পুলিশের নজর এড়িয়ে তাঁর ঐতিহাসিক অন্তর্ধানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে বাড়িটিতে মিউজ়িয়াম রয়েছে।

নেতাজির ব্যবহৃত সামগ্রী, আসবাব, চিঠিপত্র এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা দলিল সেখানে সংরক্ষিত। গবেষণা ও পড়াশোনার জন্য রয়েছে পাঠাগারও। ফলে শুধু বেড়ানো নয়, নেতাজির জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার সুযোগও রয়েছে এখানে।

এর সঙ্গে জুড়ে নিতে পারেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুভাষগ্রামের কোদালিয়ার বাড়ি। নেতাজির পরিবারের সঙ্গে এই বাড়ির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে এবং শৈশবে তিনি এখানে এসেছেন। বাড়িটি সংস্কার করা হয়েছে এবং স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজি জন্মজয়ন্তী ও দুর্গাপুজোর সময় দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হয় বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ রয়েছে।

এলগিন রোডের বাড়িতে যেতে নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন থেকে হাঁটতে পারেন। সুভাষগ্রামের কোদালিয়ার বাড়ির জন্য শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার ট্রেনে সুভাষগ্রাম স্টেশনে নেমে অটো বা টোটো নেওয়া যায়।

৩. অরবিন্দ ভবন: একই দিনে জন্মদিন ও স্বাধীনতার ইতিহাস

১৫ অগস্টের সঙ্গে অরবিন্দ ভবনের সম্পর্ক নিছক কাকতালীয় নয়। শ্রীঅরবিন্দ (Sri Aurobindo)-এর জন্ম ১৮৭২ সালের ১৫ অগস্ট। ভারতের স্বাধীনতা দিবসও ১৫ অগস্ট। তাই এই দিনটিতে কলকাতার ৮, শেক্সপিয়র সরণির অরবিন্দ ভবনে যাওয়া অন্য রকম তাৎপর্য বহন করে।

বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি অরবিন্দ ছিলেন দার্শনিক, কবি ও আধ্যাত্মিক সাধক। শহরের ব্যস্ততার মধ্যে গাছপালায় ঘেরা এই বাড়ির পরিবেশও বেশ আলাদা। ভিতরে রয়েছে পাঠাগার, অরবিন্দের লেখা বই, তাঁর ও শ্রীমার বিভিন্ন স্মারক এবং ধ্যানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান। অরবিন্দের দেহাবশেষও এখানে সমাধিস্থ রয়েছে।

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে বাসে থিয়েটার রোড বা বিড়লা তারামণ্ডল এলাকায় নেমে হেঁটে পৌঁছনো যায়। চাইলে সরাসরি ক্যাব বা ট্যাক্সিতেও যাওয়া সম্ভব।

৪. শরৎচন্দ্রের সামতাবেড়: সাহিত্য, নদী আর এক টুকরো গ্রামবাংলা

স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু বন্দুক হাতে বিপ্লবীদের কাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। সাহিত্যের মাধ্যমেও দেশাত্মবোধ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সূত্রেই স্বাধীনতা দিবসের ভ্রমণ তালিকায় রাখা যায় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (Sarat Chandra Chattopadhyay) সামতাবেড়ের বাড়ি।

দেউলটির কাছে পানিত্রাসের সামতাবেড় গ্রামে জীবনের শেষ কয়েক বছর কাটিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। তাঁর ব্যবহৃত নানা জিনিস এবং লেখালেখির স্মৃতিবাহী সামগ্রী এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে ‘পথের দাবি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে স্বাধীনতা আন্দোলন, বিপ্লব এবং দেশপ্রেমের নানা দিক উঠে এসেছে।

এই সফরের সঙ্গে প্রকৃতিও জুড়ে যায়। কাছেই রয়েছে রূপনারায়ণ নদী। বর্ষার দিনে নদীর চরিত্র আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। দেউলটির রাধা ও মদনগোপাল মন্দিরের টেরাকোটার কাজও দেখে নিতে পারেন।

হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে দেউলটি যাওয়া যায়। স্টেশন থেকে অটো নিয়ে সামতাবেড় পৌঁছনো যায়। সড়কপথেও কলকাতা থেকে গাড়িতে যাওয়া সম্ভব।

৫. আলিপুর জেল মিউজ়িয়াম: যে জেলে বন্দি ছিলেন নেতাজি, অরবিন্দ, নেহরুরা

কলকাতার মধ্যেই এমন একটি জায়গা রয়েছে, যেখানে ঢুকলেই স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চোখের সামনে চলে আসে। সেটি আলিপুর জেল মিউজ়িয়াম। ব্রিটিশ আমলের আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের একটি অংশকে বর্তমানে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে এই জেলের সম্পর্ক গভীর। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীঅরবিন্দ, জওহরলাল নেহরু (Jawaharlal Nehru), বিধানচন্দ্র রায় (Bidhan Chandra Roy) এবং আরও বহু রাজনৈতিক বন্দির সঙ্গে এই জেলের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। তাঁদের বন্দিজীবনের স্মৃতি, কারাকক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নিদর্শন এখানে দেখা যায়।

জাদুঘরে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-র ব্যবস্থাও রয়েছে। মঙ্গলবার থেকে রবিবার দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যার পর। ফলে ১৫ অগস্ট যাওয়ার আগে সেদিনের প্রবেশ ও অনুষ্ঠানসূচি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়াই ভালো।

যাতায়াতের জন্য যতীন দাস বা নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন সুবিধাজনক। সেখান থেকে অটো বা টোটো নেওয়া যায়। আলিপুরগামী বাসেও পৌঁছনো সম্ভব।

১৫ অগস্টের ছুটি তাই শুধু শহরের কোনও রেস্তরাঁ বা শপিং মলে কাটানোর মধ্যে আটকে রাখার প্রয়োজন নেই। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতা ও তার আশপাশে এমন একাধিক জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যায়, যেখানে স্বাধীনতার ইতিহাস, সাহিত্য, বিপ্লবী আন্দোলন এবং বাংলার অতীত একসঙ্গে ধরা দেয়। পরিবার নিয়ে দিন-সফর হোক বা ইতিহাসপ্রেমীদের ছোট্ট ট্রিপ—এই পাঁচ ঠিকানার যে কোনও একটি বেছে নিলে স্বাধীনতা দিবসের বেড়ানো নিছক ঘোরাঘুরি না হয়ে হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসকে নতুন করে চেনার অভিজ্ঞতা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন