স্বাধীনতা দিবসের (Independence Day) প্রাক্কালে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুললেন লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk)। শুক্রবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তাঁর দাবি, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আর সেই পরিবর্তনের পথ হিসেবে তিনি দিয়েছেন ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’-এর ডাক। ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সৎ, নীতিবান ও জনমুখী নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার নতুন ভাবনার প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ওয়াংচুকের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে কী ভাবে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়, সেই প্রশ্ন। তাঁর মতে, পাঁচ বছর অন্তর ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার বর্তমান ব্যবস্থার কিছু মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। কোনও নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে ভোটারদের হাতে আরও কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা উচিত বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে নিশানা না করে ওয়াংচুক বলেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সরকারই অতীতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা কণ্ঠস্বর দমনের অভিযোগের মুখে পড়েছে। তাঁর বক্তব্য, সমস্যাটি কোনও একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেই জড়িত। সেই কারণেই তিনি দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে বৃহত্তর পরিবর্তনের কথা বলছেন।
২০৪৭ সালে স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্ণ হবে। সেই সময়ের মধ্যে ভারতকে আরও উন্নত ও সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন ওয়াংচুক। তাঁর দাবি, এশিয়ার কয়েকটি দেশ গত কয়েক দশকে ভারতের তুলনায় দ্রুত এগিয়েছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে তিনি অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ওয়াংচুকের মতে, শুধু অর্থনৈতিক বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। দেশের শিক্ষা, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রবণতা বদলানো না গেলে ২০৪৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান নিয়ে নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থার প্রসঙ্গেও সরব হয়েছেন লাদাখের এই সমাজকর্মী। NEET-UG পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের প্রতিবাদে তিনি দীর্ঘ অনশন করেছিলেন। দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party)-র আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর অবস্থান জুড়ে গিয়েছিল। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের (Dharmendra Pradhan) পদত্যাগ।
শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর শিক্ষামন্ত্রকের দায়িত্ব পান প্রহ্লাদ যোশী (Pralhad Joshi)। তবে নতুন শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরও শিক্ষাক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি বলেই অভিযোগ ওয়াংচুকের।
এই প্রসঙ্গেই তিনি আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা সরাসরি দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। পরীক্ষায় অনিয়ম, তরুণদের উদ্বেগ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতি দূর না হলে ২০৪৭-এর উন্নত ভারতের লক্ষ্য পূরণ কঠিন হতে পারে।
ওয়াংচুকের মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতিই দেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা। তাঁর যুক্তি, নেতৃত্ব সঠিক না হলে তার প্রভাব গোটা দেশের উপর পড়ে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, এখনও বহু সৎ ও নীতিবান রাজনীতিক রয়েছেন। সেই মানুষদের পাশাপাশি দেশের ‘সেরা মেধাবী’ নাগরিকদের একত্র করে নতুন রাজনৈতিক ভাবনা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে ‘রাইট টু রিকল’ (Right to Recall)-এর ধারণার সঙ্গেও মিল খুঁজে পাচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে ভোটারদের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে ভারতে বর্তমানে এমন সাধারণ সাংবিধানিক ব্যবস্থা চালু নেই।
ওয়াংচুক তাঁর বক্তব্যে অতীতের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের কথাও স্মরণ করেছেন। তাঁর দাবি, সেই আন্দোলনের অভিঘাতে দিল্লিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছিল। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পরে দুর্নীতির সমস্যা অন্য রূপে আরও বড় হয়ে সামনে এসেছে বলে মনে করেন তিনি।
এবার তাই দেশজুড়ে মানুষের কাছ থেকে নতুন নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক ভাবনার পরামর্শ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন ওয়াংচুক। তাঁর লক্ষ্য কোনও একটি দলকে সামনে আনা নয়, বরং সৎ, নিঃস্বার্থ, সাহসী ও নীতিবান মানুষদের চিহ্নিত করা। তাঁদের ভাবনা থেকেই ভবিষ্যৎ ভারতের একটি ‘নতুন মানচিত্র’ তৈরির কথা বলেছেন তিনি।
স্বাধীনতা দিবসের আগে সোনম ওয়াংচুকের এই বার্তা তাই নিছক রাজনৈতিক সমালোচনায় আটকে থাকছে না। দেশের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার পদ্ধতি, জবাবদিহি, শিক্ষা এবং ২০৪৭-এর ভারতের ভবিষ্যৎ—এই চারটি বিষয়কে এক সূত্রে বেঁধে তিনি যে ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’-এর কথা বলেছেন, তা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



