মুর্শিদাবাদের সুতিতে তিন শিশুকে কুপিয়ে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার যুবক গোলাম সারওয়ার ওরফে বাদশাকে শুক্রবার জঙ্গিপুর আদালতে তোলা হয়েছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত রক্তাক্ত হাঁসুয়া নিয়ে এক টোটোচালকের গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে টোটোয় চেপে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। ঘটনায় চার শিশুর উপর হামলা হয়েছিল, যাদের মধ্যে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও এক শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সুতির রঘুনাথপুর এলাকায় বৃহস্পতিবার ঘটে ভয়াবহ এই ঘটনা। অভিযুক্তের হামলার শিকার শিশুরা সম্পর্কে তার ভাগ্নি ও ভাইঝি। মৃত তিন শিশুর বয়স যথাক্রমে ৪, ১০ এবং ১২ বছর। গুরুতর জখম আরও এক শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই গোলাম সারওয়ারকে গ্রেফতার করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে খুন এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছে। শুক্রবার তাকে জঙ্গিপুর আদালতে হাজির করিয়ে সাত দিনের পুলিশি হেফাজত চাওয়া হয়েছে। কেন এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হল, তার উত্তর খুঁজতেই অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বাদশার বাড়ির কাছেই থাকত তার ভাগ্নি-ভাইঝিরা। প্রতিদিন বিকেলে তারা একসঙ্গে খেলাধুলো করত। বৃহস্পতিবারও কয়েক জন শিশু এলাকার একটি দোকান থেকে মেহেন্দি কিনে বাদশার বাড়িতে যায়। বাড়ির বারান্দায় বসে তারা হাতে মেহেন্দি পরছিল।
অভিযোগ, সেই সময় আচমকাই ঘর থেকে ধারালো হাঁসুয়া নিয়ে বেরিয়ে আসে বাদশা। কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিশুদের উপর হামলা শুরু করে সে। তিন জনকে এলোপাথাড়ি কোপানোর পর রান্নাঘরে থাকা আরও এক শিশুর উপরেও হামলা চালানো হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, রক্তাক্ত হাঁসুয়াটি সঙ্গে নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় অভিযুক্ত। এরপর এক টোটোচালককে ভয় দেখিয়ে তাঁর গলায় ওই অস্ত্র ঠেকায় সে। সেই টোটোতেই চেপে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে বাদশা বলে দাবি স্থানীয়দের।
তবে কী কারণে এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, শিশুদের খেলাধুলোর সময় চিৎকার-চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় অভিযুক্ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। যদিও এই দাবির সত্যতা এখনও তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
পুলিশ পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার নেপথ্যের কারণ জানার চেষ্টা করছে। অভিযুক্তের আচরণ, ঘটনার আগে তাঁর গতিবিধি এবং শিশুদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীদের একাংশের নজরে এসেছে, অভিযুক্ত অত্যন্ত অন্তর্মুখী এবং ঘরকুনো স্বভাবের বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁর ঘর থেকে কিছু ওষুধও উদ্ধার হয়েছে। সেগুলি মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র ওষুধ পাওয়ার ভিত্তিতে হামলার কারণ মানসিক অসুস্থতা—এমন সিদ্ধান্তে এখনও পৌঁছয়নি পুলিশ।
ঘটনার তদন্তে শুক্রবার সকালে এলাকায় পৌঁছয় পুলিশ। সেই সময় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখান। অভিযুক্তের কঠোরতম শাস্তি, এমনকি ফাঁসির দাবিও ওঠে। কেউ কেউ অভিযুক্তের বাড়ি বুলডোজ়ার দিয়ে ভেঙে দেওয়ার দাবিও জানান।
তিন শিশুর মৃত্যুতে গোটা এলাকায় শোক ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বেঁচে যাওয়া শিশুটির চিকিৎসা চলছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, পরিকল্পনা করে হামলা করা হয়েছিল কি না এবং অভিযুক্তের মানসিক অবস্থার সঙ্গে ঘটনার কোনও যোগ রয়েছে কি না—সব দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ। আদালতের নির্দেশের পর পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদেই তদন্তে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।



