ব্রেখটের নাটকের বিখ্যাত সংলাপ।গ্যালিলিওর সাথে তাঁর ছাত্র আন্দ্রেয়ার সংলাপ।খানিকটা এইরকম। অত্যাচারের পর গির্জাই ঠিক, আমি ভুল বলে ধুঁকতে ধুঁকতে ক্লান্ত শরীরে বেরোচ্ছেন গ্যালিলিও, তখনই সেই সংলাপ। ছাত্র আন্দ্রেয়া বলে ‘দুর্ভাগা সে দেশ, যেখানে বীর নেই।’ গ্যালিলিওর পাল্টা উত্তর, ‘দুর্ভাগা সে দেশ, যেখানে শুধু বীরেরই প্রয়োজন হয়।’ ২০২৪ সালে ভারতবর্ষের নির্বাচনের প্রাক্কালে এই কথাটাই ঘুরে-ফিরে প্রাসঙ্গিক হচ্ছে।
আরও পড়ুন: প্রচারে গিয়ে মহিলাকে চুমু খগেনের, প্রার্থীর পাশে দাঁড়ালেন ভোটার

কারণ ভারতের ভোট রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে মুখ। বামপন্থীরা যদিও তাদের বক্তব্যে বারবার বোঝাতে সচেষ্ট নেতার থেকে পার্টির কর্মসূচি অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষ শেষমেশ নেতাই খোঁজে।দিনের শেষে বামপন্থীদেরও জ্যোতি বসু এবং তারপর বুদ্ধ’বাবুর আপাদমস্তক ভালো মানুষ ইমেজ সামনে রেখেই ভোট লড়তে হয়।কংগ্রেস,বিজেপি অথবা আঞ্চলিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই রকম। মিস্টার ‘জেন্টেলম্যান’ নেহেরু,ইন্দিরা গান্ধী,রাজীব গান্ধী এদের সামনে রেখেই ভোট উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে দল। বিজেপির আভ্যন্তরীণ আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় অটল বিহারী বাজপেয়ী,এল কে আডবাণী এবং বর্তমান সময়ে মোদীর ইমেজ।

যতোই ক্যাডার বেসড পার্টি হোক।বিজেপি’কে প্রচার করতে হয় “মোদী নেহী তো কউন”, ” মোদী কা গ্যারান্টি”,”আব কী বার মোদী সরকার”। সিপিআইএম সমর্থকেরা এখনো বুদ্ধ বাবুর শিল্প নীতির কথা’কে জনমানসে আনার সময় ব্যবহার করেন বুদ্ধবাবুর বাহুল্যবর্জিত জীবনের কথা। আঞ্চলিক দলগুলো তো টিকেই আছে একজন করে ক্যারেশমেটিক ফিগারের উপর।নাহলে আমাদের বাংলাতেই দেখুন ২৯৪টা আসনে মমতা বন্দোপাধ্যায়’কে প্রার্থী হতে হয়।
এই বিষয়ে একটা জিনিস পরিলক্ষিত এতো কিছুর পরেও লোকসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক উপাদান কাজ করেছে। ইন্দিরা গান্ধী’কে ইমার্জেন্সির মতো সিদ্ধান্তের মাশুল গুনতে হয়েছে। আবার ৩৭০ প্রত্যাহার,রাম মন্দির থেকে সিএএ,এনআরসির মতো বিষয় রয়েছে।কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ বীর খোঁজে। খোঁজে বলিউডি কায়দায় হিরোর ইমেজ। সাধারণ মানুষ যেখানে লার্জার দ্যান দ্যা লাইফ ইমেজ নিয়ে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করবে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল’কে যেই কারণে পার্টি বানানোর পর বেশীদিন অপেক্ষা করতে হয়নি।আম আদমির মধ্যের সুপ্ত বাসনা দুর্নীতি মুক্ত প্রশাসন’কে একটা সঠিক দিশা দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন।

রাজনীতির এই স্পেক্ট্রামে এখন প্রশ্ন হলো মোদীর বিরুদ্ধে মুখ কে? ইন্ডিয়া বলে যেই মঞ্চ সেই মঞ্চের মুখ থেকে রাজনৈতিক ইচ্ছা কোনোটাই ঠিক নেই বলেই কী মানুষ বিরক্ত? প্রচুর জমায়েতের পর অনেক মিটিং এর পরেও কী সাধারণ মানুষ’কে জোট না আসন সমঝোতা নাকি অন্য কিছু এইসব মানুষকে বোঝানো যাবে। দেশের মানুষ আবেগ প্রবণ তাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে মোদী সরকার ভালো জানে। যার সবচেয়ে সাম্প্রতিক নিদর্শন রাম মন্দির। এই বাংলার কথায় আশা যাক।যে কথা বারবার বলা হয়েছে তার মধ্যে একটা কথা বারবার এসেছে “ফ্রম ভিয়েতনাম টু জয় শ্রী রাম”। কেনো? তার কারণ কী শুধুই বামেদের ক্ষয়িষ্ণু সংগঠন? নাকি বামেরা ২০১১ সালের নির্বাচনে ব্যর্থতার পরেও কোনো মুখ তুলে আনতে পারেনি।

বাম নেতারা এই সব কথায় বিশ্বাসী না হলেও প্রশ্ন জাগছে। নিবিড়ে প্রচার হচ্ছে সৃজন,দীপ্সিতা,প্রতীক উর, সুজন,সেলিম ইত্যাদিরা ক্যান্ডিডেট দারুণ। সত্যিই তো বাংলার রাজনীতির বর্তমান অবস্থায় মানুষ ক্যান্ডিডেট’কে প্রাধান্য দেয় বেশী। মানুষ চায় একজন মসীহা। পার্টির কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে বাম নেতাদের বোঝা উচিত সবার আগে ক্ষমতায় ফিরে আসা জরুরী। আর সেইজন্য উচিত ক্যাপ্টেন নির্বাচন করে এগিয়ে যাওয়া। ঠিক যেই কারণে বিজেপির এই ভরা সময়েও রেজাল্ট আশানুরূপ হবে কিনা সন্দেহজনক। কারণ সাধারণ জনমানসে মুখ কে,এই নিয়ে তীব্র আলোচনা রয়েছে। চায়ের দোকান থেকে ট্রেনের কামড়া, অফিস থেকে পাড়ার ক্লাব কান পাতলেই এই আলোচনা বোঝা যায়। এতো কিছুর পরেও ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী দিতে পারেনি।
কেনো?এই প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অতি বড়ো সমর্থকও জানে দল মানে হয় মমতা নয় অভিষেক। কিন্তু এইবারের ব্রিগেডের ‘র্যাম্প ওয়াক’ থেকে যে প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে তাতে অন্তত এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে আগামীদিনে দলের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থাকবে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের উপর। তবে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অপেক্ষাকৃত নিস্তেজ থাকা কী আদৌ দলের জন্য ভালো বিজ্ঞাপন? প্রশ্ন উঠছে। সব প্রশ্নের শেষে একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে।
ইস্যু কম মুখের কদর বেশী, রাজনীতির নয়া ভাষ্যে আসল কথা ভ্যানিশ
রাজনীতিতে কী ইস্যুর কম পরেছে? নাকি দল গুলো অতীতের কারবার দেখে সাধারণ মানুষ তিতিবিরক্ত হয়ে গিয়েছে। তাই খারাপের মধ্যে একটু ভালো। খোঁজার সহজ উপায় হিসাবে বীরের খোঁজ করছে।রুটি,রুজি,শিক্ষা,স্বাস্থ্যর বদলে তাই প্রচারের প্রথম সারিতে জায়গা পেয়েছে কুকথা,ইডি,সিবিআই,চোর,ডাকাতদের মতো বিষয়! কর্পোরেট ভাষ্য ব্যবহার করলে যেই মুখের ব্যান্ডিং যতো ভালো সেই দলের ভোট ততো ভালো। “ফ্রম ইস্যু টু মুখ” পালটে যাওয়া রাজনৈতিক ভাষ্য’কে দল গুলোই পারে উলটে দিতে।



