১০ দিনের ডেডলাইন! দলত্যাগী ২০ সাংসদের পদ খারিজে স্পিকারকে চাপে ফেলে সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূল

দলত্যাগী ২০ সাংসদের সদস্যপদ খারিজের আবেদনে এখনও সিদ্ধান্ত না হওয়ায় স্পিকার ওম বিড়লার উপর চাপ বাড়াচ্ছে কালীঘাট তৃণমূল। ৭-১০ দিনের মধ্যে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি অভিষেকদের।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গের ভোটের পর তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙনকে ঘিরে এবার আইনি লড়াই আরও তীব্র করার প্রস্তুতি। দলত্যাগী ২০ সাংসদের সদস্যপদ খারিজ নিয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা (Om Birla)-র কাছে আবেদন জমা দেওয়ার পরেও সিদ্ধান্ত না হওয়ায়, আর অপেক্ষা না করে সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি দিল কালীঘাট তৃণমূল (Kalighat TMC)। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) নেতৃত্বাধীন শিবির সূত্রে খবর, আরও এক সপ্তাহ থেকে সর্বোচ্চ ১০ দিন পরিস্থিতি দেখেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের সাংসদদের একাংশের দলত্যাগকে কেন্দ্র করে। তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত ২০ জন লোকসভা সাংসদ ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)-তে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। একইসঙ্গে তাঁরা এনডিএ-কে সমর্থনের অবস্থান নিয়েছেন। এই দলবদলকে কেন্দ্র করেই লোকসভার স্পিকারের কাছে তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিষেক শিবিরের বক্তব্য, দলত্যাগী সাংসদদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আলাদা করে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। ১৯ জুনের বৈঠকের পর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের কাছে মোট ২০টি আবেদন জমা দিয়ে দশম তফসিলের (Tenth Schedule) আওতায় সাংসদদের অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানান। তৃণমূলের যুক্তি, দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে স্বেচ্ছায় অন্য দলে যোগ দেওয়া দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আওতায় পড়ে।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত ওই আবেদনগুলির বিষয়ে স্পিকারের তরফে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। একই সঙ্গে এনসিপিআইকে লোকসভায় পৃথক দল বা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়নি। যদিও দলবদল করা সাংসদদের আসনবিন্যাসে পরিবর্তন ইতিমধ্যেই দেখা গিয়েছে। জুলাইয়ে লোকসভা সচিবালয়ের সিদ্ধান্তে ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের জন্য আলাদা আসন বরাদ্দ করা হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতেই বুধবার লোকসভা স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেন অভিষেক-সহ কালীঘাট তৃণমূলের সাংসদরা। দলত্যাগী সাংসদদের বিরুদ্ধে দায়ের করা আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি লোকসভায় তৃণমূল সাংসদদের পিছনের সারিতে বসানো নিয়েও আপত্তি জানানো হয় বলে দলীয় সূত্রের দাবি। বৈঠকের পর অভিষেকের বার্তা ছিল, আবেদনের পর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলেও সিদ্ধান্ত না হলে আদালতের পথ খোলা রয়েছে।

তৃণমূলের এই অবস্থানের পিছনে রয়েছে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের সাংবিধানিক কাঠামো। সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী, কোনও নির্বাচিত সদস্য স্বেচ্ছায় নিজের রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ ত্যাগ করলে তাঁর অযোগ্যতার প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক দায়িত্ব স্পিকারের উপরই রয়েছে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর সিদ্ধান্ত বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।

স্পিকার কতদিনের মধ্যে এই ধরনের আবেদন নিষ্পত্তি করবেন, তা নিয়েও সুপ্রিম কোর্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। Keisham Meghachandra Singh মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, বিশেষ পরিস্থিতি না থাকলে দলত্যাগ সংক্রান্ত আবেদন সাধারণত তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা উচিত। ২০২৫ সালের একটি সুপ্রিম কোর্টের রায়েও ওই তিন মাসের ‘outer limit’-এর উল্লেখ রয়েছে।

তবে সেই তিন মাসের সময়সীমা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলেই তৃণমূলের সামনে একটি আইনি প্রশ্ন থাকছে। স্পিকারের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আদালতে গেলে আদালত সেই আবেদন কীভাবে গ্রহণ করবে বা কী ধরনের নির্দেশ দেবে, তা নির্ভর করবে মামলার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও প্রার্থনার উপর। ফলে কালীঘাট শিবিরের ৭-১০ দিনের অপেক্ষা মূলত একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত—এটি সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত কোনও নতুন সময়সীমা নয়।

এদিকে দলত্যাগী ২০ সাংসদকে ঘিরে সংসদের ভিতরেও সমীকরণ বদলেছে। তাঁদের মধ্যে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, দেব, ইউসুফ পাঠান-সহ একাধিক পরিচিত মুখ রয়েছেন। জুনে ওই সাংসদরা স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ার অবস্থান জানান এবং পৃথক রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।

তৃণমূলের জন্য এই লড়াইয়ের রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। একদিকে বিধানসভায় দলীয় ভাঙন, অন্যদিকে লোকসভায় সাংসদদের দলত্যাগ—দুই ক্ষেত্রেই দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও আইনসভায় সংখ্যার সমীকরণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। লোকসভায় ২০ সাংসদের অবস্থান নিয়ে স্পিকারের সিদ্ধান্ত তাই শুধু সদস্যপদ সংক্রান্ত বিষয় নয়, সংসদীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ কৌশলের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

এখন নজর লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কালীঘাট তৃণমূল আপাতত আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে দ্রুত আইনি পথে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের খবর। শেষ পর্যন্ত স্পিকার আবেদনগুলি নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন, এনসিপিআইকে কীভাবে বিবেচনা করা হয় এবং তৃণমূল সত্যিই সুপ্রিম কোর্টে যায় কি না—এই তিনটি প্রশ্নই আগামী কয়েক দিনের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নজরকাড়া বিষয় হয়ে উঠতে চলেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন