কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (NRS Medical College and Hospital)-এ রহস্যজনক মৃত্যু এক নার্সের। বুধবার রাতে স্ত্রীরোগ বিভাগের এইচডিইউয়ের শৌচাগার থেকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাঁকে। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করলেও বাঁচানো যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাতে এইচডিইউতে ডিউটিতে ছিলেন ওই নার্স। রাতে নার্সিং স্টেশনে কাজ করার পর তাঁকে আর দেখতে না পাওয়ায় সহকর্মীরা খোঁজ শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ কোনও সন্ধান না মেলায় হাসপাতালের শৌচাগারের দিকে যান তাঁরা।
প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, ওই নার্সের কাছে ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল ছিল। সেগুলি নিয়ে তিনি শৌচাগারের দিকে গিয়েছিলেন বলে হাসপাতাল সূত্রে দাবি। প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেলেও তিনি নার্সিং স্টেশনে ফিরে না আসায় সহকর্মীদের সন্দেহ হয়।
এর পর শৌচাগারের দরজার কাছে গিয়ে তাঁকে একাধিকবার ডাকেন সহকর্মীরা। ভিতর থেকে কোনও সাড়া না মেলায় রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ দরজা ভেঙে তাঁকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল সূত্রে ফেন্টানিল ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এলেও ওই ওষুধের কারণেই নার্সের মৃত্যু হয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। ময়নাতদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ফরেন্সিক পরীক্ষার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
ফেন্টানিল একটি শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ, যা চিকিৎসাক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়। তাই হাসপাতালের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ওই ওষুধ কীভাবে নার্সের কাছে এল, তিনি কেন সেটি নিয়ে শৌচাগারে গেলেন এবং মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না—এই প্রশ্নগুলিও তদন্তের অংশ হতে পারে।
পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। মৃত নার্সের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর আগে কারও সঙ্গে কোনও কথা হয়েছিল কি না, ডিউটির সময় তাঁর গতিবিধি কী ছিল এবং হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট এলাকায় কী ধরনের নজরদারি ছিল, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
এই ঘটনার পর ফের সামনে এসেছে কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। বিশেষ করে রাতের ডিউটিতে থাকা নার্স ও মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এক মহিলা চিকিৎসক-পরুয়ার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর সরকারি হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তা, সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলো এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিয়ে একাধিক পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছিল।
কিন্তু তারপরও সরকারি হাসপাতালগুলিতে একের পর এক অনভিপ্রেত ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের মার্চে আরজি কর হাসপাতালের লিফ্ট দুর্ঘটনায় এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছিল। একই মাসে স্ট্রেচার না পেয়ে এক অসুস্থ প্রবীণকে হেঁটে শৌচাগারে যেতে হয়েছিল এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ উঠেছিল।
এনআরএসে নার্সের এই মৃত্যুর সঙ্গে আগের ঘটনাগুলির সরাসরি কোনও যোগ রয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে সরকারি হাসপাতালের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা এবং নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে। আপাতত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্তেই নির্ভর করছে এই রহস্যমৃত্যুর আসল কারণ সামনে আসার বিষয়টি।



