তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের বিদ্রোহ এবার পৌঁছে গিয়েছে লোকসভা স্পিকারের দরজায়। ২০ বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদের সদস্যপদ খারিজ চেয়ে স্পিকার ওম বিড়লার কাছে পৃথক আবেদন জমা দিয়েছে তৃণমূল। দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আওতায় তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হলেও, এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত জুন মাসে। তৃণমূলের ২০ জন লোকসভা সাংসদ দল থেকে বেরিয়ে Nationalist Citizens Party of India বা NCPI-তে যোগ দেওয়ার কথা জানান। তাঁদের দাবি ছিল, তাঁরা নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং লোকসভায় পৃথক ব্লক হিসেবে কাজ করার অধিকার তাঁদের রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পরই তৃণমূলের তরফে পাল্টা আইনি ও সাংবিধানিক লড়াই শুরু হয়। দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং লোকসভায় তৃণমূলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে ২০ জন সাংসদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক আবেদন জমা দেন।
অভিষেকের যুক্তি, তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে পরে অন্য একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দিলে তা দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আওতায় পড়ে। সংবিধানের দশম তফসিলের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, কোনও সাংসদ স্বেচ্ছায় নিজের মূল দলের সদস্যপদ ছেড়ে দিলে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হতে পারে।
তবে এখানেই তৈরি হয়েছে মূল সাংবিধানিক প্রশ্ন। বিদ্রোহী সাংসদদের দাবি, তাঁরা একসঙ্গে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অন্য দলে মিশেছেন। তাঁদের যুক্তি, ২০ জন সাংসদ ২৮ জনের কার্যকর তৃণমূল লোকসভা সদস্যদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হওয়ায় তাঁদের ক্ষেত্রে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের ‘merger’ সংক্রান্ত সুরক্ষা প্রযোজ্য হতে পারে।
অন্যদিকে তৃণমূলের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলের দাবি, শুধু সংসদীয় দলের দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ অন্য দলে চলে গেলেই বৈধ রাজনৈতিক সংযুক্তি বা merger হয়ে যায় না। মূল রাজনৈতিক দলকেও এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে হবে। এই সাংবিধানিক ব্যাখ্যাই স্পিকারের কাছে তুলে ধরেছে তৃণমূল।
এদিকে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে লোকসভায় ২০ বিদ্রোহী সাংসদকে পৃথক আসনে বসার অনুমতি দেওয়ার ঘটনায়। জুলাইয়ে স্পিকার তাঁদের আলাদা বসার ব্যবস্থা মেনে নেন। তৃণমূল সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানায় এবং দাবি করে, সদস্যপদ খারিজ সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তির আগেই তাঁদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে কার্যত স্বীকৃতি দেওয়া ঠিক হয়নি।
এরপর জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফের স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেন। ২০ বিদ্রোহী সাংসদের বিরুদ্ধে জমা দেওয়া সদস্যপদ খারিজের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তিনি ফের আর্জি জানান। একইসঙ্গে সাংসদদের বসার ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন প্রত্যাহারের দাবিও তোলেন।
রাজনৈতিক সমীকরণও এর মধ্যে বদলেছে। NCPI হিসেবে চিহ্নিত এই ২০ সাংসদকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ের শেষে তাঁরা NDA-র সংসদীয় বৈঠকেও যোগ দেন। ফলে তৃণমূল থেকে বেরিয়ে যাওয়া এই সাংসদদের ভবিষ্যৎ অবস্থান এখন শুধু দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, জাতীয় রাজনীতির সমীকরণের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনও একই—২০ বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদের সদস্যপদ শেষ পর্যন্ত খারিজ হবে, নাকি তাঁদের NCPI-তে যোগদান সাংবিধানিক সুরক্ষা পাবে? এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করছে লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার সিদ্ধান্তের উপর। তাই তৃণমূলের এই ভাঙন আগামী দিনে সংসদের অঙ্ক এবং বাংলার রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



