ছেঁড়া, মলিন কিংবা বারবার ব্যবহারে নষ্ট হয়ে যাওয়া ছোট অঙ্কের নোট নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার এবার নতুন সমাধান খুঁজছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। ₹১০ এবং ₹২০ মূল্যের পলিমার বা ‘প্লাস্টিক’ নোটের ফিল্ড ট্রায়ালে অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রাথমিক ভাবে দুই মূল্যমানের ১০০ কোটি করে, মোট ২০০ কোটি পলিমার নোট পরীক্ষামূলক ভাবে বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কাগজের ₹১০ ও ₹২০ নোট তুলে দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষার সময়ে কাগজের নোটের পাশাপাশি পলিমার নোটও চলবে।
মঙ্গলবার রাজ্যসভায় লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ জানান, RBI-এর কেন্দ্রীয় বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে এই প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। RBI Act, 1934-এর ২৫ নম্বর ধারার আওতায় দেওয়া সেই প্রস্তাবেই অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্র।
অর্থাৎ, আপাতত এটি কোনও পূর্ণাঙ্গ নোট বদলের সিদ্ধান্ত নয়। বাস্তবে পলিমার নোট কতটা কার্যকর, কতদিন টেকে, সাধারণ মানুষের ব্যবহারে কেমন সাড়া মেলে এবং নিরাপত্তার দিক থেকে কতটা সুবিধা পাওয়া যায়—এসব যাচাই করতেই শুরু হচ্ছে ফিল্ড ট্রায়াল।
কেন ₹১০ ও ₹২০ নোট দিয়েই পরীক্ষা?
কম মূল্যমানের নোট সবচেয়ে বেশি হাতবদল হয়। ফলে বাজারে ₹১০ ও ₹২০-এর নোট তুলনামূলক দ্রুত ছিঁড়ে যায়, ময়লা হয় এবং ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এই কারণেই প্রথম পরীক্ষার জন্য এই দুই মূল্যমানকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
পলিমার নোট সাধারণ কাগজের পরিবর্তে বিশেষ ধরনের সিন্থেটিক পলিমার সাবস্ট্রেটের উপর তৈরি হয়। এই উপাদান জল, আর্দ্রতা এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের ধকল তুলনামূলক ভাবে বেশি সহ্য করতে পারে। ফলে একই নোট দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব হলে বারবার নতুন নোট ছাপার প্রয়োজনও কমতে পারে।
RBI গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা (Sanjay Malhotra) আগেই জানিয়েছিলেন, পলিমার কারেন্সি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। জুলাইয়ে RBI-এর নোট ছাপার সংস্থা পলিমার সাবস্ট্রেট সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছ থেকে দরপত্রও চেয়েছিল।
কাগজের নোট কি বন্ধ হয়ে যাবে?
এখনই এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেই। বরং কেন্দ্র স্পষ্ট করেছে, পলিমার নোট চালু হলেও বর্তমান কাগজের নোটের সঙ্গে সেগুলি চলবে। ফিল্ড ট্রায়ালের ফলাফল বিশ্লেষণ করার পরই নিয়মিত ভাবে পলিমার নোট বাজারে ছাড়ার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তাই সাধারণ মানুষের জন্য এখনই পুরনো ₹১০ বা ₹২০ নোট বদলে ফেলার কোনও প্রশ্ন নেই। বর্তমান কাগজের নোট বৈধই থাকবে। নতুন নোট এলে তা পরীক্ষামূলক ভাবে নির্দিষ্ট পরিসরে ব্যবহারের মাধ্যমে কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
পলিমার নোটের সুবিধা কোথায়?
পলিমার নোটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এর স্থায়িত্ব। সাধারণ কাগজের নোটের তুলনায় এই ধরনের নোট দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য বলে বিভিন্ন দেশে দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে ছোট মূল্যমানের নোট দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যার ক্ষেত্রে পলিমার কারেন্সি কার্যকর হতে পারে।
এর পাশাপাশি নোটে বিশেষ নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যোগ করার সুযোগও রয়েছে। পলিমার সাবস্ট্রেটে স্বচ্ছ অংশ বা অন্যান্য বিশেষ সিকিউরিটি ফিচার ব্যবহার করা যায়, যা জাল নোট তৈরি কঠিন করতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে নোট দ্রুত বাতিল করে নতুন নোট ছাপার প্রয়োজন কমলে দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রা ব্যবস্থাপনার খরচও কমতে পারে। তবে পলিমার নোট তৈরির প্রাথমিক খরচ, উৎপাদন পরিকাঠামো এবং ব্যবহারের পরে পুনর্ব্যবহার—সবকিছু বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কবে হাতে আসতে পারে নতুন নোট?
এখনই নির্দিষ্ট ভাবে বলা যাচ্ছে না যে সাধারণ মানুষের হাতে কবে থেকে নিয়মিত ₹১০ ও ₹২০ পলিমার নোট পৌঁছবে। কারণ বর্তমানে যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তা মূলত ফিল্ড ট্রায়ালের জন্য। ট্রায়াল সফল হলে তবেই বৃহত্তর পরিসরে নিয়মিত ইস্যুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
RBI গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা আগে জানিয়েছিলেন, পলিমার নোটের পরিকল্পনা তখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল এবং এর সুবিধা-অসুবিধা খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রস্তাবটি পরীক্ষামূলক ভাবে এগোনোর অনুমোদন পেয়েছে।
ফলে ভারতের মুদ্রা ব্যবস্থায় এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা। তবে আপাতত ₹১০ ও ₹২০-এর পলিমার নোটকে ‘নতুন টাকা’ হিসেবে নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতিতে পরীক্ষাধীন একটি বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা উচিত। পরীক্ষার ফল ভালো হলে ভবিষ্যতে দেশের নোট ব্যবস্থাপনায় পলিমার কারেন্সির ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।



