‘ইতিহাস ওঁকে সম্মানের সঙ্গেই মনে রাখবে’, কয়লা মামলায় মনমোহনের রেহাইয়ে আবেগী সোনিয়া

তালাবিরা-২ কয়লাখনি মামলায় মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি প্রক্রিয়া বন্ধ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। রায়ের পর প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর সততা ও উত্তরাধিকার নিয়ে সরব সোনিয়া।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: “সমকালীন সংবাদমাধ্যম ও বিরোধীদের থেকে ইতিহাস আমার প্রতি অনেক সহৃদয় হবে”—২০১৪ সালের ৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেষ সাংবাদিক বৈঠকে বলেছিলেন মনমোহন সিং (Manmohan Singh)। প্রায় সাড়ে ১২ বছর পর তাঁর সেই মন্তব্যই যেন নতুন করে সামনে আনলেন সোনিয়া গান্ধী (Sonia Gandhi)। তালাবিরা-২ কয়লাখনি বণ্টন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করে মামলা বন্ধ করার পর প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর সততা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য রাখলেন কংগ্রেস নেত্রী। তাঁর দাবি, ইতিহাস মনমোহন সিংকে একজন শান্ত, নম্র অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই মনে রাখবে।

২৯ জুলাই ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চ মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে চলা ওই ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। আদালত সিবিআইয়ের আগে জমা দেওয়া ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করে এবং ২০১৫ সালে বিশেষ আদালতের তাঁকে অভিযুক্ত হিসেবে তলব করার নির্দেশও খারিজ করে।

মামলাটি ছিল ওড়িশার তালাবিরা-২ কয়লাখনি বণ্টন নিয়ে। ২০০৫ সালে ওই কয়লাখনি হিন্ডালকো ইন্ডাস্ট্রিজকে বরাদ্দ করা হয়েছিল। সেই বণ্টন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, শিল্পপতি কুমার মঙ্গলম বিড়লা, প্রাক্তন কয়লা সচিব পি সি পারেখ-সহ কয়েক জনকে মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে তলব করা হয়েছিল।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মনমোহন সিংকে তলব করার আগেই সিবিআই ওই মামলায় ক্লোজার রিপোর্ট দিয়েছিল। ২০১৪ সালে তদন্তকারী সংস্থা দু’টি রিপোর্টে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর মতো উপযুক্ত ভিত্তি খুঁজে পায়নি। কিন্তু ২০১৫ সালে বিশেষ আদালত সেই রিপোর্ট গ্রহণ না করে মনমোহন সিং-সহ অন্যদের তলব করে। পরে সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।

সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের তাৎপর্য এখানেই। আদালত বলেছে, তদন্তকারী সংস্থার ক্লোজার রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে নিম্ন আদালতের মামলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল না। ফলে সিবিআইয়ের রিপোর্ট গ্রহণ করে ফৌজদারি প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। মনমোহন সিং ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রয়াত হওয়ায় তাঁর আবেদনটি সরাসরি বিচারাধীন রাখার প্রশ্নও ছিল না; তবু বিশেষ আদালতের তলবের বৈধতা খতিয়ে দেখে শীর্ষ আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছয়।

এই রায়কেই মনমোহন সিংয়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন সোনিয়া। তাঁর বক্তব্য, বহু বছর ধরে যে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মনমোহনের সততা, নিষ্ঠা ও জবাবদিহির রেকর্ডের কথাও নিজের লেখায় তুলে ধরেছেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন।

সোনিয়ার অভিযোগ, মনমোহন সিংকে ঘিরে ‘পরিকল্পিত’ রাজনৈতিক প্রচারের পিছনে প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, নাগরিক সমাজ এবং আরএসএস-বিজেপির মতো বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা ছিল। তিনি আরও দাবি করেন, ওই প্রচারের শেষ পর্যন্ত কোনও ভিত্তি রইল না। তাঁর ভাষায়, ২৯ জুলাইয়ের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।

তবে সোনিয়ার বক্তব্য শুধু মনমোহনের প্রশংসায় থেমে থাকেনি। বর্তমান নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) সরকারের কাজের ধরন নিয়ে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপ দিতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি ও সিবিআইকে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দল বদল করলে তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অবস্থান বদলে যায় বলেও কটাক্ষ করেছেন তিনি।

মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কার অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির কথাও নিজের লেখায় তুলে ধরেছেন সোনিয়া। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা সামলানো, অর্থনৈতিক সংস্কার, উচ্চ বৃদ্ধির হার, শিক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা, মনরেগা এবং ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির মতো বিষয়কে তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

সোনিয়ার বক্তব্যের শেষেও ফিরে এসেছে মনমোহনের সেই ২০১৪ সালের ভবিষ্যদ্বাণী। তাঁর আক্ষেপ, এই দিনটি দেখার জন্য মনমোহন নিজে বেঁচে নেই। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তাঁর সেই কথা—সময়ের সঙ্গে ইতিহাস তাঁকে আরও সহানুভূতির চোখে দেখবে—ক্রমশ সত্যি হয়ে উঠছে বলেই মনে করছেন কংগ্রেস নেত্রী।

তবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—সুপ্রিম কোর্ট সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করে তালাবিরা-২ মামলার ফৌজদারি প্রক্রিয়া বন্ধ করেছে এবং ২০১৫ সালের তলবের নির্দেশ খারিজ করেছে। এটিকে ‘সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ’ হিসেবে বিস্তৃত করা ঠিক হবে না। আদালতের সিদ্ধান্তটি নির্দিষ্ট ওই কয়লাখনি বণ্টন মামলার তদন্ত ও ক্লোজার রিপোর্টকে কেন্দ্র করেই।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর