ভয়াবহ পরিস্থিতি কঙ্গোয়, কয়েক মাসেই ২০০০ জনের মৃত্যু! ইবোলা নিয়ে সতর্ক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ডিআর কঙ্গোয় ইবোলার সংক্রমণ ভয়াবহ গতিতে বাড়ছে। সরকারি হিসাবে আক্রান্ত ৪,৩৮১, মৃত্যু ২,০১১। বুন্দিবুগিয়ো স্ট্রেনের বিরুদ্ধে এখনও নেই অনুমোদিত টিকা বা প্রমাণিত চিকিৎসা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ইবোলা নিয়ে ফের ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মধ্য আফ্রিকায়। ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (DR Congo) সংক্রমণের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৪ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১১ অগস্ট পর্যন্ত দেশে ৪,৩৮১ জনের শরীরে ইবোলা সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ২,০১১ জনের। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে মৃতের সংখ্যা ২ হাজার পেরিয়ে যাওয়ায় এটিকে ইবোলার ইতিহাসে দ্রুততম গতিতে ছড়ানো প্রাদুর্ভাবগুলির অন্যতম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত সূত্র মে মাসের ঘোষণারও আগে। সাম্প্রতিক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, ডিআর কঙ্গোর ইতুরি (Ituri) প্রদেশে জানুয়ারি বা তারও আগে ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়ে থাকতে পারে। ১৫ মে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা হওয়ার আগেই সেখানে ৫০০-র বেশি সন্দেহভাজন সংক্রমণের সন্ধান মিলেছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

এখনও পর্যন্ত ডিআর কঙ্গোর পাঁচটি প্রদেশে সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছে। বিলম্বিত শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি এবং দুর্বল স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বহু প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছনোও সমস্যার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আক্রান্তদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের দ্রুত নজরদারিতে আনা যাচ্ছে না সব জায়গায়।

ইবোলার এই প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বুন্দিবুগিয়ো (Bundibugyo) ভাইরাস। এই স্ট্রেনের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনও অনুমোদিত টিকা বা প্রমাণিত চিকিৎসা নেই। যদিও পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরীক্ষামূলক চিকিৎসা এবং নতুন ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, বুন্দিবুগিয়ো স্ট্রেনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে এবং একাধিক ভ্যাকসিন প্রার্থীও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।

এই প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহতা বোঝা যায় মৃত্যুর গতির দিকে তাকালেই। কঙ্গোর বর্তমান সংক্রমণে ১ হাজার থেকে ২ হাজার মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছতে এক মাসেরও কম সময় লেগেছে। তুলনায় ২০১৮-২০২০ সালের কঙ্গো ইবোলা প্রাদুর্ভাবে ২ হাজার মৃত্যুর সীমা পার হতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। ২০১৪-২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার মহামারিই এখনও পর্যন্ত সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় ইবোলা প্রাদুর্ভাব।

কঙ্গোর পাশাপাশি উগান্ডাতেও এই ভাইরাস পৌঁছেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উগান্ডায় ২০টি নিশ্চিত সংক্রমণ এবং ২টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে ২১ জুনের পর সেখানে নতুন কোনও নিশ্চিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। ১৬ জুলাই থেকে দেশটি ৪২ দিনের নজরদারি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যার শেষে নতুন সংক্রমণ না থাকলে প্রাদুর্ভাব শেষ ঘোষণা করা সম্ভব হবে।

ইবোলা অত্যন্ত সংক্রামক এবং গুরুতর ভাইরাসঘটিত রোগ। জ্বর, দুর্বলতা, পেশিতে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া-সহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। রোগের পরবর্তী পর্যায়ে রক্তক্ষরণও হতে পারে। তবে প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে একই উপসর্গ বা একই গতিতে রোগের অগ্রগতি হয় না। দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্তকে আইসোলেশনে রাখা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরদারিতে আনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইবোলা সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত ও অন্যান্য শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত দূষিত সামগ্রী বা পরিবেশের সংস্পর্শেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফলখেকো বাদুড়কে ইবোলা ভাইরাসের সম্ভাব্য প্রাকৃতিক হোস্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এবারের প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার আগেই বহু মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নতুন সংক্রমণের বড় অংশই আগে চিহ্নিত সংক্রমণ-শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে না। এর অর্থ, কিছু এলাকায় সংক্রমণ নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সেই চেন ভাঙা স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে নজরদারি ও দ্রুত শনাক্তকরণই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ডিআর কঙ্গোয় WHO এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। একইসঙ্গে সম্ভাব্য চিকিৎসা ও টিকার পরীক্ষাও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে বুন্দিবুগিয়ো স্ট্রেনের বিরুদ্ধে এখনও অনুমোদিত প্রতিষেধক না থাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার পৌঁছনোই আপাতত সবচেয়ে বড় ভরসা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর