ফের অনিশ্চয়তার মুখে পশ্চিমবঙ্গে চাকরি বাতিল হওয়া ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীর ভবিষ্যৎ। সুপ্রিম কোর্টের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অনুযায়ী ৩১ অগস্টের মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা। তার মধ্যেই একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক পদপ্রার্থীদের নথি যাচাই আপাতত স্থগিত রাখার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া সময়মতো শেষ হবে কি না, আর তা না হলে চাকরিহারা শিক্ষকদের বেতন-সহ কাজ চালিয়ে যাওয়ার মেয়াদ বাড়বে কি না, তা নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ২০১৬ সালের গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরিহারা শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একটি বড় অংশকে ফের নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যোগ্য প্রার্থীদের নতুন করে পরীক্ষায় বসতে হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই এবার নতুন নিয়োগ সম্পন্ন করার কাজ চলছে।
এর আগে সুপ্রিম কোর্ট সময়সীমা বাড়িয়ে ৩১ অগস্ট পর্যন্ত নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিল। একই সঙ্গে যোগ্য বলে বিবেচিত চাকরিহারা শিক্ষকদের ওই সময় পর্যন্ত বেতন-সহ কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে ৩১ অগস্টের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হলে তাঁদের পরবর্তী অবস্থান কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এই পরিস্থিতিতে সোমবার হঠাৎ এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক পদপ্রার্থীদের নথি যাচাই স্থগিত রাখার কথা জানানো হয়েছে। ১২, ১৩ এবং ১৭ অগস্ট যে যাচাই পর্ব হওয়ার কথা ছিল, তা আপাতত হচ্ছে না। অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের ৭ অগস্টের নির্দেশিকার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে ইতিমধ্যেই শুরু হওয়া নিয়োগ প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক পদে নথি যাচাইয়ের কাজ এগোলেও একাদশ-দ্বাদশের ক্ষেত্রে নতুন করে এই স্থগিতাদেশ গোটা সময়সূচিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন চাকরিহারা শিক্ষকদের একাংশ।
এর নেপথ্যে রয়েছে রাজ্যের ওবিসি তালিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা। ২০১০ সালের পর তৈরি হওয়া ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত একাধিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা হয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে হাই কোর্টের রায়ের পর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। পরবর্তী সময়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ওই মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
এই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার প্রভাব নতুন নিয়োগের সংরক্ষণ কাঠামো এবং প্রার্থীদের নথি যাচাইয়ের উপর পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি। কোন প্রার্থী কোন সংরক্ষিত শ্রেণির আওতায় পড়বেন, সেই বিষয়টি স্পষ্ট না হলে মেধাতালিকা ও নিয়োগের পরবর্তী ধাপ এগোনো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
চাকরিহারা শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েও তাঁরা এখনও নিশ্চিত নন কবে হাতে পাবেন নিয়োগপত্র। ৩১ অগস্টের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই উদ্বেগ বাড়ছে তাঁদের মধ্যে।
আন্দোলনকারী শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডলের বক্তব্য, “৩১ অগস্টের পর কী হবে, আমরা কেউ জানি না। আমাদের চাকরি থাকবে কি না, সেটাও স্পষ্ট নয়। এখনও পর্যন্ত নবম-দশমের ভেরিফিকেশন চলছিল। একাদশ-দ্বাদশের কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াও প্রায় শেষের দিকে ছিল। এখন ঠিক কী হচ্ছে, বুঝতে পারছি না।”
তাঁর আরও অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত তাঁদের হাতে নিয়োগপত্র পৌঁছয়নি। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলারও আবেদন জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এখনও কোনও স্পষ্ট আশ্বাস তাঁরা পাননি বলেই তাঁর বক্তব্য।
এখন মূল প্রশ্ন, ৩১ অগস্টের মধ্যে একাদশ-দ্বাদশের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে কি না। নথি যাচাই স্থগিত থাকায় সময়সীমা মেনে নিয়োগ শেষ করা কঠিন হলে রাজ্য সরকার ফের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে অতিরিক্ত সময় চাইবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, সময়সীমা বাড়ানো না হলে যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষকদের বেতন ও কর্মরত থাকার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নও ক্রমশ বড় হচ্ছে। ফলে ওবিসি সংক্রান্ত জটিলতা মিটিয়ে দ্রুত নথি যাচাই ও নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা এখন চাকরিপ্রার্থীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



