চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে পর্যটন, নিরাপত্তা ও দর্শনার্থীদের পরিষেবায় একাধিক নতুন উদ্যোগের পরিকল্পনা করেছে প্রশাসন। গঙ্গাবক্ষে রিভার ক্রুজ়ে চন্দননগরে পৌঁছে প্রতিমা দর্শন, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ যাতায়াতের ব্যবস্থা, পুজোর তথ্য জানাতে অ্যাপ এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য বাইক অ্যাম্বুল্যান্স—এমন একাধিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন চন্দননগরের বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ। বিপুল জনসমাগমের কথা মাথায় রেখে যাতায়াত, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং বিসর্জনের নিরাপত্তাতেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত পরিষেবাগুলির চূড়ান্ত সূচি ও চালুর সময়সীমা এখনও বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি।
দুর্গাপুজোর পর বাংলার অন্যতম আকর্ষণ চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো। বিশালাকার প্রতিমা, ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপ এবং চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা দেখতে প্রতি বছর বহু দর্শনার্থী ভিড় করেন ফরাসডাঙায়। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত এই জনসমাগম সামলাতে প্রশাসনের বিভিন্ন দফতর, পুজো কমিটি, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং পূর্ত দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
রিভার ক্রুজ়ে চন্দননগর, সঙ্গে ফেরি পরিষেবার পরিকল্পনা
এ বারের জগদ্ধাত্রী পুজোয় পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহের বক্তব্য অনুযায়ী, প্যাকেজের মাধ্যমে পর্যটকেরা বাবুঘাট থেকে রিভার ক্রুজ়ে চন্দননগর ঘাটে পৌঁছে প্রতিমা দর্শন করে ফিরতে পারবেন। পাশাপাশি চন্দননগর থেকে ভদ্রেশ্বর পর্যন্ত ফেরি পরিষেবা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সড়কপথের ভিড় এড়িয়ে নদীপথে চন্দননগরের পুজো দেখার সুযোগ পাবেন পর্যটকেরা। তবে ক্রুজ়ের সময়সূচি, টিকিটের দাম, বুকিংয়ের নিয়ম এবং ফেরি পরিষেবা চালুর দিনক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত ঘোষণা এখনও বাকি।
প্রবীণদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নিয়ে যাওয়া হবে মণ্ডপে
জগদ্ধাত্রী পুজোর ভিড়ে প্রবীণ নাগরিকদের পক্ষে একাধিক মণ্ডপ ঘুরে দেখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁদের কথা মাথায় রেখে বিশেষ দর্শন-পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা করেছে প্রশাসন।
বিধায়কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট একটি জায়গা থেকে প্রবীণদের নিয়ে গিয়ে মণ্ডপ ও প্রতিমা দর্শন করানোর পর আবার তাঁদের আগের জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘক্ষণ হাঁটা বা ভিড়ের মধ্যে যাতায়াতের সমস্যা কিছুটা কমতে পারে। তবে এই পরিষেবায় কারা সুযোগ পাবেন, কীভাবে নাম নথিভুক্ত করতে হবে এবং কোথা থেকে যাত্রা শুরু হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পুজোর জন্য বিশেষ অ্যাপ, মিলবে মণ্ডপ ও যাতায়াতের তথ্য
দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য একটি বিশেষ অ্যাপ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন পুজো মণ্ডপের অবস্থান, যাতায়াতের সুবিধা-অসুবিধা এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি হেল্পলাইন নম্বর রাখার কথাও জানানো হয়েছে।
বিপুল ভিড়ের মধ্যে কোন পথে গেলে সুবিধা হবে, কোথায় চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে এবং জরুরি প্রয়োজনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—এই ধরনের তথ্য সহজে পাওয়া গেলে দর্শনার্থীদের সুবিধা হতে পারে। তবে অ্যাপটির নাম, প্রকাশের তারিখ এবং ডাউনলোডের লিঙ্ক প্রকাশ্যে এলে তবেই সেই তথ্য নিশ্চিতভাবে জানানো সম্ভব হবে।
ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হলে বাইক অ্যাম্বুল্যান্সের পরিকল্পনা
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত ভিড় বাড়লে সরু রাস্তায় সাধারণ অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে পৌঁছনো কঠিন হতে পারে। সেই সমস্যা মোকাবিলায় বাইক মেডিক্যাল অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিধায়ক।
পুজো দেখতে গিয়ে কেউ আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাঁর কাছে পৌঁছনোর জন্য এই পরিষেবা কাজে লাগতে পারে। পাশাপাশি চুঁচুড়া ও চন্দননগর—দুই হাসপাতালকেই প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দর্শনার্থীদের জন্য চিকিৎসা ও সেবাকেন্দ্র তৈরি, ঘাটে যাতায়াতের সুবিধা এবং রাস্তার সমস্যা কমানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
তবে বাইক অ্যাম্বুল্যান্সের সংখ্যা, পরিষেবা পরিচালনার দায়িত্ব এবং চিকিৎসাকেন্দ্রগুলির নির্দিষ্ট অবস্থান এখনও জানানো হয়নি।
বিসর্জনেও নজরদারি, একাধিক দফায় বৈঠক প্রশাসনের
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রস্তুতি নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দফতর ও কেন্দ্রীয় পুজো কমিটির সঙ্গে একাধিক বৈঠক হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাস্তার অবস্থা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা পরিষেবা এবং বিসর্জনের শোভাযাত্রা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চোরবাগানের পুজোয় পদপিষ্ট হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পর বড় জমায়েতের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চন্দননগরেও ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি পরিষেবার জন্য রাস্তা খালি রাখা এবং বিসর্জনের সময় নজরদারির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহের বক্তব্য, এ বারের প্রস্তুতিতে প্রশাসনের বিভিন্ন দফতর একসঙ্গে কাজ করছে। তবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলির মধ্যে কোনগুলি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে, তার পূর্ণাঙ্গ ছবি মিলবে প্রশাসনের চূড়ান্ত নির্দেশিকা প্রকাশের পর।



