তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট ঘিরে নতুন বিতর্কে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। দলের কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠলেও ব্যাঙ্কের নথিতে এখনও নিজের নাম থাকায় লেনদেন স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়েছেন অরূপ বিশ্বাস। কোটি টাকার দলীয় তহবিলকে কেন্দ্র করে এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
এক সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন অরূপ বিশ্বাস। তৃণমূলের অন্দরে ফিরহাদ হাকিম ও অরূপকে যথাক্রমে ‘ডান কান’ এবং ‘বাঁ কান’ বলেও উল্লেখ করা হতো। ফিরহাদ ইতিমধ্যেই বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন। এবার অরূপের পদক্ষেপ ঘিরেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সূত্রের খবর, একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের শাখা ম্যানেজারকে চিঠি দিয়ে তৃণমূলের দলীয় অ্যাকাউন্টে লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আবেদন জানিয়েছেন অরূপ। ওই চিঠিতে তিনি নিজেকে দলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন।
এদিকে তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ জানিয়েছেন, গত ৫ জুন দলের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সাংগঠনিক রদবদলের মাধ্যমে শুভাশিস চক্রবর্তীকে নতুন কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে। তবে সেই পরিবর্তন ব্যাঙ্কের নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী একসময় তৃণমূলের ওই অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬৭৫ কোটি টাকা ছিল। বর্তমানে সেই অঙ্ক কিছুটা কমলেও কয়েকশো কোটি টাকার তহবিল এখনও রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন যে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, দলের বর্তমান সাংগঠনিক সংকট এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা দ্বন্দ্বের মধ্যেই এই পদক্ষেপ করেছেন অরূপ। তৃণমূলের ভাঙন এবং নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসার পর দলীয় তহবিলের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবির নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ নেতাদের একাংশও দলীয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তৎপর। এই পরিস্থিতিতে তহবিলের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছিল বলেও সূত্রের দাবি।
অরূপ বিশ্বাসের আশঙ্কা, তাঁর আগাম সই করা কিছু চেক এখনও দলীয় কার্যালয়ে থাকতে পারে। নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের আবহে সেই চেকের অপব্যবহার হলে আইনি দায় তাঁর উপরই বর্তাতে পারে। সেই কারণেই ব্যাঙ্ককে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
চিঠিতে অরূপ উল্লেখ করেছেন, অতীতে দলীয় আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগের জেরে তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও ধরনের আর্থিক অনিয়ম বা বিতর্কে জড়াতে চান না বলেই তিনি লেনদেন বন্ধ রাখার আবেদন জানিয়েছেন।
বিদ্রোহী শিবিরের নেতা সন্দীপন সাহার মতে, সম্ভাব্য অনিয়ম রুখতেই অরূপ এই পদক্ষেপ করেছেন। অন্যদিকে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী কটাক্ষ করে বলেছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অরূপ বিশ্বাস রাজনৈতিক অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট ঘিরে এই নতুন অধ্যায় শুধু দলীয় তহবিলের প্রশ্ন নয়, বরং দলের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্বের লড়াই কোন দিকে এগোবে, সেই ইঙ্গিতও বহন করছে।



