পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও শুভেন্দু অধিকারীর পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। জেলা রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্দোলনের ময়দান, তারপর রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র— ধাপে ধাপে লড়াই করেই আজ বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর আসনে পৌঁছেছেন তিনি। একসময় যিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম বিশ্বস্ত সৈনিক, তিনিই এখন বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী। মধ্যবিত্ত মানসিকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নিরন্তর রাজনৈতিক পরিশ্রম— এই তিনকে সঙ্গী করেই শুভেন্দুর এই উত্থান বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে অধিকারী পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব বহুদিনের। বাবা শিশির অধিকারী দীর্ঘদিন সাংসদ ছিলেন। তবে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও শুভেন্দুকে নিজের জমি তৈরি করতে হয়েছে রাস্তায় নেমেই। ছাত্র রাজনীতি থেকেই তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু। এরপর ধীরে ধীরে তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।


২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় বলে মনে করা হয়। শিল্পায়নের নামে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। সেই আন্দোলনই শুধু তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ভিত নড়িয়ে দেয়নি, বাংলার রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছিল। আর সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে উঠে আসে শুভেন্দুর নাম।
এরপর তৃণমূল সরকারের আমলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। পরিবহণ, সেচ-সহ বিভিন্ন দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতা এবং জেলা স্তরে শক্তিশালী জনভিত্তির জন্য দ্রুতই তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে জায়গা করে নেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে রাজনৈতিক মহলে বড় চমক দিয়ে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই সময় তাঁর দলবদলকে বাংলার রাজনীতিতে বড় টার্নিং পয়েন্ট বলেই দেখা হয়েছিল। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি রাজ্যে দলের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।


২০২১ সালের নন্দীগ্রাম নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনায় উঠে আসেন শুভেন্দু। আর ২০২৬ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর— দুই কেন্দ্র থেকেই জয় পেয়ে কার্যত নিজের রাজনৈতিক শক্তির প্রমাণ দেন তিনি। বিশেষ করে ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো বিজেপির কাছে সবচেয়ে বড় প্রতীকী জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুভেন্দুর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সংগঠন পরিচালনার ক্ষমতা এবং মাটির সঙ্গে সংযোগ। জেলা থেকে বুথ স্তর পর্যন্ত সংগঠনকে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছেন।
আজ সেই কাঁথির মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেই বাংলার প্রশাসনিক শীর্ষে। রাজনৈতিক লড়াই, দলবদল, বিতর্ক— সবকিছুর মধ্য দিয়েই শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্থান এখন বাংলার রাজনীতির অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।







