একটি ছবিতে তিন নির্বাচন কমিশনার পাশাপাশি। সেই ছবিকেই সামনে রেখে এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের যাবতীয় প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একার সিদ্ধান্তে এসআইআর হয়নি। তিন কমিশনারের সম্মতিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এসআইআর বিতর্কের পুরো ছবিটা শুধু ওই একটি ফ্রেমে আটকে নেই। তার কয়েক দিন আগেই দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য—সুখবীর সিংহ সন্ধু এবং বিবেক জোশি—বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। সেই আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকায় নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া, Form 6 বদল এবং ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও ছিল।
এই দুই তথ্য পাশাপাশি আসতেই এসআইআর নিয়ে বিতর্কের নতুন জায়গা তৈরি হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তিন কমিশনারের সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতেও নির্বাচন কমিশন ফের জানিয়েছে, এসআইআর-এর নির্দেশগুলি সর্বসম্মত ভাবেই অনুমোদিত হয়েছিল।
রবিবার সেই অবস্থানকেই রাজনৈতিক ভাষায় সামনে আনলেন শুভেন্দু।
তাঁর বক্তব্য, শনিবারের বৈঠকের ছবিই দেখিয়ে দিচ্ছে যে তিন কমিশনারের মধ্যে কোনও বিভাজন নেই। এসআইআর কারও একার সিদ্ধান্ত নয়। বিরোধীরা একটি সংবাদপ্রতিবেদনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কিন্তু এখানেই উঠে আসছে অন্য প্রশ্নটি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে যে ১৪টি আপত্তির কথা বলা হয়েছে, সেগুলি কোনও রাজনৈতিক দলের বক্তব্য নয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনার নিজেরাই লিখিত ভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। চারটি আপত্তি একই দিনেও জানানো হয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, কমিশনের কোনও সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত ভাবে অনুমোদিত হয়েছিল কি না, আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশনের দুই সদস্য আপত্তি জানিয়েছিলেন কি না—দুটি প্রশ্ন এক নয়।
এই পার্থক্যটিই এখন এসআইআর বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কারণ, দুই কমিশনারের আপত্তির বিষয়গুলিও ছোটখাটো প্রশাসনিক বিষয় ছিল না বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নতুন ভোটারদের নাম তোলার Form 6-এ অতিরিক্ত প্রশ্ন যোগ করা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল করা এবং ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ কী ভাবে হচ্ছে—এসব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল।
বিশেষ করে Form 6 নিয়ে বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ভোটারদের নাম তোলার এই ফর্মে এ বছর এমন একটি প্রশ্ন যোগ করা হয়েছিল, যেখানে আবেদনকারীকে জানাতে হত তাঁর নিজের বা তাঁর বাবা-মা কিংবা ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাম আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, এই পরিবর্তন নিয়েও কমিশনের অন্দরে আপত্তি উঠেছিল।
ভোটার ডেটাবেস নিয়েও আপত্তি ছিল বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকার সফ্টওয়্যার ও ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে দিল্লিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে এবং রাজ্য স্তরের Electoral Registration Officer বা ERO-দের ভূমিকা কমে যাচ্ছে। দুই কমিশনার এই বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই জায়গাতেই শনিবারের নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন জানিয়েছে, বাদ পড়া ভোটারের নাম ফের তোলা বা নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ERO-রাই নথি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার জবাবও দিয়েছে কমিশন।
শুভেন্দু অবশ্য এসআইআর বিতর্ককে দেখছেন রাজনৈতিক লড়াইয়ের দিক থেকে। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর বিরোধীরা একটি রিপোর্টকে সামনে রেখে জনগণের রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
সেই সূত্রেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সিপিএমকেও আক্রমণ করেন তিনি। তাঁর দাবি, যে সিপিএমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই করে তৃণমূলের জন্ম, এখন সেই সিপিএমের সঙ্গেই মমতার রাজনৈতিক সমন্বয় তৈরি হয়েছে।
বিধানসভায় সাম্প্রতিক একটি বিলের ভোটাভুটির প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু বলেন, তৃণমূল বিধায়কদের সঙ্গে সিপিএমের একমাত্র বিধায়কও সেই ভোটে একই অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, সেখান থেকেই দুই শিবিরের রাজনৈতিক ‘বন্ধুত্ব’ স্পষ্ট।
এসআইআর নিয়ে মমতার সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রসঙ্গও টেনে আনেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, আদালতের নির্দেশের পর ভোটার তালিকার তথ্যগত অসঙ্গতি নিয়ে বিচারকদের মাধ্যমে সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। সেই প্রক্রিয়াতেও তৃণমূলের আপত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শনিবার শ্রীরামপুরের সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তুলেছিলেন। এসআইআর নিয়ে কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। তার পরেই রবিবার শুভেন্দুর পাল্টা আক্রমণ।
তবে এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝেও মূল প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে—তিন কমিশনার শেষ পর্যন্ত এসআইআর-এর সিদ্ধান্তে সম্মত ছিলেন কি না, এবং তার আগে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কী কী মতবিরোধ হয়েছিল?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর কমিশন নিজেই দিয়েছে—এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল।
দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রকাশিত নথিতে দুই কমিশনারের একাধিক আপত্তির কথা উঠে এসেছে।
তাই তিন কমিশনারের একসঙ্গে বসার ছবিকে একমাত্র প্রমাণ হিসেবে দেখলে বিতর্কের একটি অংশই দেখা হবে। আবার ১৪টি আপত্তির খবরকে সামনে রেখে কমিশনের পরবর্তী সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করলেও ছবিটা সম্পূর্ণ হবে না।
এসআইআর বিতর্কের আসল লড়াই এখন সেখানেই—সিদ্ধান্তের ফল নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ছিল, সেই প্রশ্নে।



