বয়স ১৬ এবং ১৭। একজন স্কুলের একাদশ শ্রেণির পড়ুয়া, অন্য জন দ্বাদশ শ্রেণিতে। কিন্তু তাঁদের গবেষণার বিষয় এমন এক সমস্যা, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বের প্রবীণ জনসংখ্যার নিরাপত্তা। ক্যালিফোর্নিয়ার দুই কিশোরী-তরুণ রুওকি লি এবং জেসন ইয়াং তৈরি করেছেন এমন একটি AI-নির্ভর প্রযুক্তি, যা প্রবীণদের হাঁটার ধরন বিশ্লেষণ করে তাঁরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন কি না, তা আগেভাগেই শনাক্ত করার চেষ্টা করে। এই প্রকল্পের নাম SafeStrides। গবেষণার স্বীকৃতি হিসাবে ২০২৬ সালের Davidson Fellows হিসেবে তাঁরা পেয়েছেন ১ লক্ষ ডলারের স্কলারশিপ।
SafeStrides-এর বিশেষত্ব হল, এর জন্য কোনও বড় হাসপাতাল বা বিশেষায়িত ল্যাবরেটরিতে গিয়ে পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই। একটি স্মার্টফোন এবং শরীরে পরার সেন্সরের সাহায্যেই প্রবীণ ব্যক্তির হাঁটার ধরন ও শরীরের নড়াচড়া বিশ্লেষণ করা যায়। একটি ছোট, নির্দিষ্ট পরীক্ষার সময় স্মার্টফোনের ক্যামেরা এবং wearable sensor থেকে তথ্য সংগ্রহ করে AI সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন তৈরি করে।
প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও। রুওকি এবং জেসন জানিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের পড়ে গিয়ে গুরুতর চোট পেতে দেখেছিলেন তাঁরা। সেখান থেকেই প্রবীণদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আগে থেকে বোঝার উপায় নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। গবেষণা করতে গিয়ে তাঁরা দেখেন, প্রবীণদের মধ্যে পড়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত সাধারণ। Davidson Institute-এর প্রকল্প বিবরণ অনুযায়ী, প্রতি চার জন প্রবীণের মধ্যে একজন বছরে অন্তত এক বার পড়ে যান।
সমস্যাটা শুধু পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তার আগে হাঁটার গতি, ভারসাম্য বা শরীরের নড়াচড়ায় সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। SafeStrides-এর লক্ষ্য সেই পরিবর্তনগুলি আগেই ধরতে পারা। দুই কিশোরের দাবি, তাঁদের ব্যবস্থার মাধ্যমে পড়ে যাওয়ার কয়েক মাস আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। তবে এটি একটি গবেষণা প্রকল্প—চিকিৎসা-নির্ণয়ের বিকল্প হিসাবে একে ব্যবহার করা যায়, এমন দাবি প্রকল্পের তথ্যেও করা হয়নি।
প্রযুক্তিটি কী ভাবে কাজ করে? SafeStrides-এ স্মার্টফোনের ক্যামেরা দিয়ে হাঁটার সময় শরীরের নড়াচড়া রেকর্ড করা হয়। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে IMU (Inertial Measurement Unit) এবং pressure insole। IMU শরীরের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে, আর pressure insole পায়ের উপর কী ভাবে চাপ পড়ছে এবং ওজন কী ভাবে বণ্টিত হচ্ছে, সেই তথ্য দেয়। এই বিভিন্ন উৎসের ডেটা একসঙ্গে নিয়ে AI হাঁটার ধরন বিশ্লেষণ করে।
স্মার্টফোন অ্যাপটি wearable sensor থেকে পাওয়া তথ্যকে লাইভ ক্যামেরা ফুটেজের সঙ্গে সমন্বয় করে। ফলে শুধু একটি সেন্সরের তথ্যের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের ডেটা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়। এই কারণেই প্রকল্পটিকে multimodal AI system বলা হচ্ছে। পরীক্ষার শেষে ব্যবহারকারীকে ঝুঁকি সম্পর্কে একটি মূল্যায়নের পাশাপাশি চলাফেরা এবং বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে কিছু ব্যবহারিক পরামর্শও দেওয়া হয়।
তবে এই জায়গায় পৌঁছতে প্রকল্পটির একাধিক ধাপ পেরোতে হয়েছে। প্রথম দিকে SafeStrides ছিল Arduino-ভিত্তিক একটি prototype। সেটি কাজ করলেও বেশ বড়সড় ছিল এবং সংগৃহীত তথ্য পরীক্ষার পরে বিশ্লেষণ করতে হত। পরে দ্বিতীয় প্রজন্মের prototype-এ IMU, pressure insole, ESP32 microcontroller এবং Bluetooth module যোগ করা হয়। ফলে সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য real time-এ পাঠানো সম্ভব হয়।
এর পরের ধাপে wearable system-টিকে আরও ছোট এবং হালকা করা হয়, যাতে সেটি শরীরে পরলেও স্বাভাবিক হাঁটা বা চলাফেরায় সমস্যা না হয়। পাশাপাশি দুই তরুণ তৈরি করেন Flutter-ভিত্তিক cross-platform mobile application। Bluetooth-এর মাধ্যমে অ্যাপটি wearable hardware-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সেন্সর থেকে পাওয়া high-frequency data-কে স্মার্টফোনের ক্যামেরার লাইভ ফুটেজের সঙ্গে synchronise করে।
রুওকি লি ক্যালিফোর্নিয়ার San Jose-এর The Harker School-এর পড়ুয়া। ভবিষ্যতে তিনি AI এবং healthcare-এর সংযোগস্থলে পড়াশোনা করতে চান। তাঁর লক্ষ্য প্রযুক্তিকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে তা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। অন্য দিকে ১৭ বছরের জেসন ইয়াং Oakland-এর Head-Royce School-এর senior। তিনি electrical বা systems engineering নিয়ে পড়তে চান এবং embedded technology নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
এই প্রকল্পের স্বীকৃতি এসেছে Davidson Institute-এর ২০২৬ সালের Fellows programme থেকে। সংস্থার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার কম বয়সি প্রতিভাবান পড়ুয়াদের উল্লেখযোগ্য গবেষণা বা উদ্ভাবনী কাজের জন্য এই ফেলোশিপ দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে Ruoqi Li এবং Jason Yang-কে Engineering বিভাগে $100,000 Davidson Fellow Laureate হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
Davidson Institute জানিয়েছে, ২০২৬ সালের Fellows-দের মধ্যে লি ও ইয়াংয়ের SafeStrides প্রকল্পের লক্ষ্য হল স্মার্টফোন এবং wearable sensor ব্যবহার করে প্রবীণদের হাঁটার ধরন বিশ্লেষণ করা এবং পড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করা। সংস্থার মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বাড়িতে বসেই নিয়মিত screening-এর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্মার্টফোন ও wearable sensor ব্যবহার করে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি শনাক্ত করার গবেষণা অবশ্য নতুন নয়। বিভিন্ন গবেষণায় accelerometer, smartphone এবং machine-learning প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রবীণদের fall detection ও prevention নিয়ে কাজ হয়েছে। কিন্তু SafeStrides-এর লক্ষ্য শুধু পড়ে যাওয়ার পরে সতর্কবার্তা দেওয়া নয়; বরং পড়ে যাওয়ার আগেই ঝুঁকির পরিবর্তন শনাক্ত করার দিকে নজর দেওয়া।
এই পার্থক্যটাই দুই কিশোরের প্রকল্পের মূল বক্তব্য। সাধারণ medical alert device কোনও ব্যক্তি পড়ে যাওয়ার পরে সাহায্যের সংকেত দিতে পারে। SafeStrides-এর ধারণা তার আগের পর্যায়ে কাজ করা—হাঁটার ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না, ভারসাম্য কমছে কি না, এবং সেই পরিবর্তন ভবিষ্যতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
অবশ্য SafeStrides এখনও একটি তরুণ গবেষকদের তৈরি প্রযুক্তি। এর কার্যকারিতা, নির্ভুলতা এবং বাস্তব চিকিৎসা ব্যবস্থায় ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়ে আরও গবেষণা ও clinical validation প্রয়োজন। ফলে এটিকে এখনই প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা-পদ্ধতি হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সি দুই পড়ুয়ার তৈরি এই প্রকল্প দেখিয়ে দিচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও wearable technology-কে ব্যবহার করে প্রবীণদের নিরাপত্তার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার কাজ স্কুলস্তর থেকেই শুরু হতে পারে।



