জোড়াফুল কার? চার সপ্তাহে শুনানি, তিন মাসে ফয়সালা—তৃণমূলের নাম-প্রতীক নিয়ে সময় বেঁধে দিল সুপ্রিম কোর্ট

মমতা ও ঋতব্রত শিবিরের বক্তব্য শুনে চার সপ্তাহের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে, তার পর তিন মাসের মধ্যে নাম ও জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নির্দেশ শীর্ষ আদালতের।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক শেষ পর্যন্ত কোন গোষ্ঠীর হাতে থাকবে, তা নিয়ে টানাপড়েন আপাতত আরও কয়েক মাস চলবে। তবে অনির্দিষ্ট সময় ধরে নয়। সোমবার নির্বাচন কমিশনকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিল সুপ্রিম কোর্ট। দু’পক্ষের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথি গ্রহণের প্রক্রিয়া চার সপ্তাহের মধ্যে শেষ করতে হবে। তার পর আরও তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে কমিশনকে। অর্থাৎ, প্রায় চার মাসের মধ্যেই তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে নিষ্পত্তি করার পথে এগোতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে সোমবার মামলাটির শুনানি হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন কপিল সিব্বল এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য দিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের হয়ে ছিলেন মুকুল রোহতগি। দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পরই নির্বাচন কমিশনের জন্য এই সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয় শীর্ষ আদালত।

এই মুহূর্তে তৃণমূলের নাম এবং বহু বছর ধরে ব্যবহৃত ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীক কোনও পক্ষের হাতেই নেই। ১৭ সেপ্টেম্বরের অন্তর্বর্তী নির্দেশে নির্বাচন কমিশন ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক ‘ফ্রিজ়’ করে। অর্থাৎ, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনও গোষ্ঠীই ওই নাম বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।

কমিশনের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মামলায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকেও যুক্ত করা হয়। গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম শুনানিতে আদালত কোনও পক্ষকেই জোড়াফুল বা দলের পুরনো নাম ফিরিয়ে দেয়নি। বরং নির্বাচন কমিশনের কাছেই জানতে চেয়েছিল, দু’পক্ষের বক্তব্য, প্রমাণ এবং নথি খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে তাদের কতটা সময় প্রয়োজন।

সোমবার সেই সময়সীমাই নির্দিষ্ট করে দিল শীর্ষ আদালত। প্রথম চার সপ্তাহে দু’পক্ষের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এর পর কমিশনকে তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। ফলে এখন নজর থাকবে কমিশনের শুনানি ও নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার দিকে।

এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য অবশ্য ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। কারণ পশ্চিমবঙ্গে ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন রয়েছে। সেই নির্বাচনে জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারছে না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। কমিশনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় মমতা-শিবিরের নাম রাখা হয়েছে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং প্রতীক দেওয়া হয়েছে ‘ফুটবল পায়ে ফুটবলার’। ঋতব্রত শিবিরের নাম ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’, প্রতীক ‘খাম’।

অর্থাৎ, উপনির্বাচনের আগে পুরনো নাম ও প্রতীক ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই। কারণ সুপ্রিম কোর্টের বেঁধে দেওয়া সময়সূচি অনুযায়ী, আগে দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার প্রক্রিয়াই শেষ করতে হবে। তার পর শুরু হবে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্ব।

বিতর্কের সূত্রপাত তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর দাবি থেকে। দু’পক্ষই নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করছে। দলের নাম, নির্বাচনী প্রতীক এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিরোধের নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশন ১৯৬৮ সালের Election Symbols (Reservation & Allotment) Order-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় পদক্ষেপ করেছে।

কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তে শুধু প্রতীক নয়, দলের নামও আটকে গিয়েছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনগুলিতে পরিচিত ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং জোড়াফুল ছাড়াই নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে লড়তে হচ্ছে দুই শিবিরকে।

এই পরিস্থিতিতে সোমবারের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিল—এটি এখন আর শুধুমাত্র একটি অন্তর্বর্তী নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে বিরোধ নয়। নির্বাচন কমিশনের শুনানি এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই ঠিক হবে, ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীকের সাংগঠনিক অধিকার শেষ পর্যন্ত কোন গোষ্ঠীর হাতে থাকবে।

তবে সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। আদালতও সোমবার কোনও পক্ষের নাম বা প্রতীক ব্যবহারের অধিকার নির্ধারণ করেনি। বরং নির্বাচন কমিশনকে ন্যায্য ভাবে দুই পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ শুনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ দেখিয়েছে।

এখন তাই প্রশ্ন একটাই—চার সপ্তাহের শুনানি এবং তার পর তিন মাসের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া শেষে জোড়াফুলের ‘স্বত্ব’ কার হাতে যায়? তার উত্তর মিলবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেই।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন