জ্ঞানেশ কুমারদের নিয়োগ আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মতপার্থক্য, সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন নিয়ে সিদ্ধান্ত CJI-এর

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ২০২৩ সালের আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিভক্ত রায়। সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করা হবে কি না, এবার সিদ্ধান্ত প্রধান বিচারপতির।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) ও নির্বাচন কমিশনার (EC) নিয়োগের ২০২৩ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের মামলায় বুধবার সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গেল। মামলাটি পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার ভিন্ন মত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ভারতের প্রধান বিচারপতির (CJI) কাছে পাঠানো হয়েছে।

মামলার মূল প্রশ্ন নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা। ২০২৩ সালের আইনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে তাঁর জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে। ফলে তিন সদস্যের কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রয়েছেন।

এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছিলেন অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR) এবং কংগ্রেস নেত্রী জয়া ঠাকুর-সহ অন্যরা। বুধবার বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়।

বিচারপতি দত্ত মনে করেছেন, মামলায় ওঠা সাংবিধানিক প্রশ্নগুলি আগেই আদালতের বিভিন্ন রায়ে নির্ধারিত নীতির আলোকে বিচার করা সম্ভব। তাঁর মতে, এই পর্যায়ে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার মত, ২০২৩ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রশ্ন রয়েছে এবং বৃহত্তর বেঞ্চেই তার বিচার হওয়া উচিত।

অর্থাৎ, মূল মামলার বিচার নিয়ে নয়, আপাতত মামলাটি সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না—এই প্রশ্নেই দুই বিচারপতির মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। বিভক্ত মতের পর সাধারণ নিয়মে বিষয়টি তিন বিচারপতির বেঞ্চে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, দুই বিচারপতিই মনে করেছেন তাতে আরও সময় লাগতে পারে। তাই মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এখন প্রধান বিচারপতি সিদ্ধান্ত নেবেন, এই সাংবিধানিক প্রশ্নের বিচার করতে কত সদস্যের বেঞ্চ প্রয়োজন এবং পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করা হবে কি না। ফলে বুধবারের শুনানিতে ২০২৩ সালের নিয়োগ আইনকে বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি।

এই মামলার সূত্রপাত ২০২৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় থেকে। Anoop Baranwal বনাম Union of India মামলায় পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেছিল, সংসদ এ বিষয়ে আইন না করা পর্যন্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে একটি কমিটি কাজ করবে। আদালতের বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নির্বাহী প্রভাব থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

এর পরেই সংসদে পাশ হয় Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) Act, 2023। নতুন আইনে সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার কমিটি কাঠামো বদলে যায়। প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে বাছাই কমিটিতে রাখা হয়।

ফলে বর্তমান ব্যবস্থায় কমিটির তিন সদস্যের মধ্যে দু’জনই কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ—প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তৃতীয় সদস্য হলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। এই কাঠামো নিয়েই মামলাকারীদের মূল আপত্তি। তাঁদের বক্তব্য, এমন কমিটিতে সরকারের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

শুনানির সময় এই যুক্তি নিয়েই বিচারপতি দত্তও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মন্ত্রিসভার যৌথ দায়বদ্ধতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করবেন—এমন পরিস্থিতি বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলনেতার উপস্থিতির কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তাঁর যুক্তি ছিল, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মনোনীত মন্ত্রী সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তাঁরা গণতন্ত্রের স্বার্থে কাজ করবেন না—এমন অনুমান করা ঠিক নয়। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচিত সাংবিধানিক পদাধিকারীদের উপর আস্থা না রেখে কেন বাইরের কোনও ব্যক্তিকে বাছাই প্রক্রিয়ায় রাখা প্রয়োজন হবে।

শুনানিতে বিচারপতি দত্ত বিচারপতি নিয়োগের প্রসঙ্গেও কেন্দ্রের যুক্তির জবাব দেন। বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিচারপতিরাই সিদ্ধান্ত নেন—এই ধারণাকে তিনি সরাসরি নাকচ করে বলেন, বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা রয়েছে।

এই মামলার সঙ্গে বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগ নিয়ে চলা রাজনৈতিক বিতর্কেরও পরোক্ষ যোগ রয়েছে। কারণ, তিনি যে ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পেয়েছেন, সেই একই ২০২৩ সালের আইনই এখন সুপ্রিম কোর্টে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে বুধবারের শুনানিতে জ্ঞানেশ কুমারের ব্যক্তিগত নিয়োগের বৈধতা নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা ও বৃহত্তর বেঞ্চে তার বিচার প্রয়োজন কি না।

ফলে আপাতত ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন বাতিল বা বহাল—কোনও সিদ্ধান্তই হয়নি। বিভক্ত রায়ের পর বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে যাওয়ায় পরবর্তী ধাপে সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের সম্ভাবনাই এখন মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন