‘জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করতে হবে’, বাংলায় পুনর্নির্বাচন চাইলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়

SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনারের আপত্তির রিপোর্ট ঘিরে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রেফতারির দাবি, পুরনো তালিকায় ফের ভোটের দাবিও তুলেছেন তিনি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision) ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতবিরোধের খবর সামনে আসতেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত বার্তায় তাঁর দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করা উচিত এবং SIR-এর প্রভাবে যে সব রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে পুরনো ভোটার তালিকা ধরে ফের ভোট করাতে হবে।

মমতার এই বক্তব্যের পটভূমিতে রয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট। সেখানে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য—সুখবীর সিং সান্ধু (Sukhbir Singh Sandhu) এবং বিবেক যোশী (Vivek Joshi)—কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।

রিপোর্ট অনুযায়ী, আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার-সংক্রান্ত তথ্য ও সফটওয়্যার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। দুই কমিশনারের কয়েকটি নথিতে সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘বেআইনি’ বলেও আপত্তি জানানোর কথা প্রকাশিত হয়েছে।

এই রিপোর্টকে সামনে রেখেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, কমিশনের অভ্যন্তরেই যদি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ থাকে, তা হলে সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে সাধারণ ভোটারের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে।

মমতা বলেন, “এই চেয়ারটা ওঁর জন্য নয়।” জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে তাঁর আরও অভিযোগ, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ের ভোটে তাঁর ভূমিকার কারণেই বিজেপি লাভবান হয়েছে। তবে এগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অভিযোগ; নির্বাচন কমিশন বা আদালতের কোনও সিদ্ধান্তে এই অভিযোগগুলি প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই।

এর পরেই আরও কড়া দাবি তোলেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর কথায়, “জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির সিদ্ধান্তের কারণে কেন দেশের মানুষকে ভুগতে হবে।

শুধু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতেই থামেননি মমতা। SIR-কে কেন্দ্র করে যে সব রাজ্যে নির্বাচন হয়ে গিয়েছে, সেখানেও নতুন করে ভোট করানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, পুরনো ভোটার তালিকা ফিরিয়ে এনে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে ফের জনমত যাচাই করা উচিত।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই দাবি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে SIR-পর্বে ভোটার তালিকায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, SIR-এর সময় পশ্চিমবঙ্গে ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল এবং তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষেরও বেশি ভোটার পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই আবেদনের বড় অংশ এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত বা ডুপ্লিকেট ভোটারের মতো কারণ বিবেচনা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে কমিশন নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জানিয়েছে, নির্বাচনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার জন্য আইনে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।

এদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্টে গোয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কয়েকজন ভোটারের ক্ষেত্রে স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিকরা যোগ্যতা মেনে নেওয়ার পরেও কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যারের কারণে সেই সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত করা যাচ্ছিল না বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

অর্থাৎ, বিতর্কটি এখন শুধুমাত্র ভোটার তালিকা সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশনের ভিতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ এবং ভোটার ডেটা ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে মমতার দাবি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। তিনি শুধু SIR নিয়ে আপত্তি জানানো নয়, ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়া নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে তার প্রভাব যদি নির্বাচনের উপর পড়ে থাকে, তা হলে পুরনো তালিকা ধরে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে নতুন করে ভোট হওয়া উচিত।

তবে মমতার এই দাবি রাজনৈতিক অবস্থান এবং অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। নির্বাচন বাতিল বা পুনর্নির্বাচনের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে; শুধু রাজনৈতিক দাবির ভিত্তিতে কোনও নির্বাচন বাতিল হয়ে যায় না।

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টের পর এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—SIR-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিগুলির কী পরিণতি হয়েছে এবং ভোটার তালিকায় সংশোধনের সঙ্গে ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়া নির্বাচনের ফলের কোনও আইনি সম্পর্ক তৈরি হয় কি না। এই প্রশ্নগুলির উত্তরই পরবর্তী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন