‘জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করতে হবে’, LOC জারির দাবি অভিষেকের, SIR নিয়ে তীব্র আক্রমণ

SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনারের আপত্তির রিপোর্ট সামনে আসার পর জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে LOC ও গ্রেফতারের দাবি তুললেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে দুই কমিশনারের আপত্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি নিশানা করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার কলকাতায় ফিরে তিনি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে লুকআউট সার্কুলার বা LOC জারি এবং তাঁকে গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন।

অভিষেকের অভিযোগ, SIR-এর কারণে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ ভোট দিতে পারেননি। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, তার দায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে নিতে হবে। তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা, তার কারণ এবং নির্বাচনে তার প্রভাব নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

এই মন্তব্যের পটভূমিতে রয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের রিপোর্ট। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু (Sukhbir Singh Sandhu) এবং বিবেক যোশী (Vivek Joshi) গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার SIR এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগের মধ্যে ছিল তাঁদের অজ্ঞাতসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভোটার ডেটাবেসে পরিবর্তন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন।

রিপোর্ট অনুযায়ী, আপত্তিগুলির কয়েকটি ক্ষেত্রে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া, ভোটার বাদ দেওয়া এবং ভোটার তালিকার ডেটাবেসে কারা পরিবর্তন করতে পারবেন—এসব বিষয় সামনে এসেছিল। দুই কমিশনারের নথিতে কিছু পদক্ষেপকে ‘অননুমোদিত’ ও ‘বেআইনি’ বলেও আপত্তি জানানোর কথা প্রকাশিত হয়েছে।

এই রিপোর্টের প্রসঙ্গ টেনেই অভিষেকের আরও দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে LOC জারি করা উচিত, যাতে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন। তাঁর বক্তব্য, “তাঁকে গ্রেফতার করা উচিত”—এবং SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকায় কারচুপি করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এমন কোনও ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বা তাঁকে গ্রেফতারের জন্য কোনও সরকারি তদন্তকারী সংস্থা LOC জারি করেছে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি। LOC বা গ্রেফতারের দাবি আপাতত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই রয়েছে।

অভিষেক এদিন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে তোলেন। তাঁর অভিযোগ, সংসদে আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব থাকা নির্বাচনী কমিটি নির্বাচন কমিশনার বেছে নিতে পারে। তাঁর বক্তব্য, এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া কমিশনারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এই দাবির সঙ্গে অবশ্য নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়টি জড়িত। Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমার ও সুখবীর সিং সান্ধুকে ২০২৪ সালে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সময় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী আপত্তি জানিয়েছিলেন। পরে জ্ঞানেশ কুমার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার সময়ও বিরোধী পক্ষ থেকে আপত্তি নথিভুক্ত হয়েছিল।

অভিষেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে সুপ্রিম কোর্টে চলা SIR-সংক্রান্ত মামলার প্রসঙ্গও। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ইতিমধ্যেই আদালতের নজরদারিতে আপিলের প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, SIR-সংক্রান্ত আপিল ট্রাইব্যুনালগুলিতে প্রায় ৩৮.২০ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে এবং তার মধ্যে প্রায় ১.০২ লক্ষের নিষ্পত্তি হয়েছে।

এর মধ্যে ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম SIR-পরবর্তী প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছিল বলে কমিশনের তথ্য। সেই তালিকা থেকে বাদ পড়া ২২.২১ লক্ষেরও বেশি ভোটার নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আপিল করেছেন।

অভিষেক এদিন আরও অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকার সংশোধনের কারণে বহু মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। প্রবীণ মানুষ এবং অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ভোট দিতে না-পারা মানুষের ক্ষোভ ও যন্ত্রণার দায় একদিনের রাজনৈতিক বিতর্কে শেষ হবে না।

পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। Indian Express-এর রিপোর্টে দুই কমিশনারের একাধিক লিখিত আপত্তির কথা উঠে এলেও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান হল, কমিশনারদের মধ্যে আলোচনার সময় মতপার্থক্য থাকতে পারে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়।

অভিষেক অবশ্য এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাঁর দাবি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ, তাঁর বিরুদ্ধে LOC এবং গ্রেফতারের দাবি সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক আক্রমণেরই অংশ।

এদিন কলকাতায় ফিরে অভিষেক বলেন, “বাংলার অভিশাপ লেগে গিয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, বিজেপি রাজনৈতিক স্বার্থে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করেছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, SIR নিয়ে যে প্রশ্নগুলি সামনে এসেছে তার প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, জাতীয় স্তরেও তার গুরুত্ব রয়েছে।

তবে SIR নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তি এবং আদালতের বিচারাধীন বিষয়—এই তিনটি আলাদা স্তরের ঘটনা। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে উঠে এসেছে, অন্যদিকে SIR-সংক্রান্ত ভোটারদের আপিলের বিচারপ্রক্রিয়া এখনও চলছে। ফলে অভিষেকের তোলা অভিযোগগুলির আইনি পরিণতি কী হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত, নথি এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন