ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে আসার পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হল সিপিআইএম। বুধবার দলের পলিটব্যুরো বিবৃতিতে দাবি করেছে, জ্ঞানেশ কুমারের আর পদে থাকার অধিকার নেই। একই সঙ্গে অবিলম্বে SIR প্রক্রিয়া বন্ধ এবং নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানিয়েছে দল।
সিপিআইএমের বক্তব্য, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত রিপোর্টে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের যে তথ্য সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। দলের দাবি, তিন সদস্যের কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু (Sukhbir Singh Sandhu) এবং বিবেক যোশী (Vivek Joshi)—SIR এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার। ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার ডেটাবেস পরিচালনার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের আপত্তি ছিল। কয়েকটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘বেআইনি’ বলেও আপত্তি জানানো হয়েছিল।
এই রিপোর্টের উল্লেখ করেই সিপিআইএমের অভিযোগ, কমিশনের ভিতরে দুই সদস্য আপত্তি জানালেও তাঁদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। দলের বক্তব্য, আইন অনুযায়ী তিন নির্বাচন কমিশনার সমমর্যাদার। কোনও বিষয়ে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা।
সিপিআইএমের আরও অভিযোগ, ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়াকে এতদিন বিকেন্দ্রীভূত বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতা ক্রমশ কেন্দ্রীয় স্তরে চলে যাচ্ছে। দলের দাবি, এর ফলে মাঠে থাকা নির্বাচনী আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই অভিযোগের সঙ্গে গোয়ার একটি ঘটনার কথাও উঠে এসেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্টে। সেখানে ৯৭ জন ভোটার প্রয়োজনীয় নথি দিয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে যোগ্য বলে বিবেচিত হলেও সফটওয়্যারে সেই সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত করা যায়নি বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
নতুন ভোটারদের জন্য Form 6 নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, SIR-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নতুন ঘোষণার অংশ Form 6-এ যুক্ত করা হয়েছিল। বিবেক যোশী মে মাসেই এর বিরোধিতা করে জানিয়েছিলেন, সংশ্লিষ্ট নিয়ম পরিবর্তন না করে Form 6 বদলানো যায় না। পরে সুখবীর সিং সান্ধুও ওই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘বেআইনি’ বলে আপত্তি জানান।
জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি নিশানা করেছে সিপিআইএম। দলের পলিটব্যুরোর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং এর জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে জবাবদিহি করতে হবে। “জ্ঞানেশ কুমার আর পদে থাকতে পারেন না”—বিবৃতিতে এমনই দাবি করা হয়েছে। এটি সিপিআইএমের রাজনৈতিক অবস্থান।
একই সঙ্গে SIR অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে সিপিআইএম। দলের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন নিয়েও সরব হয়েছে দলটি। ২০২৩ সালের সংশ্লিষ্ট আইন বাতিল করে নতুন আইন তৈরির দাবি জানিয়েছে সিপিআইএম। তাদের প্রস্তাব, নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধান বিচারপতিকে রাখা হোক।
এই নিয়োগ কাঠামো নিয়েই বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। বুধবার দুই বিচারপতির বেঞ্চে মামলাটি সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে মতপার্থক্য হয়েছে। বিষয়টি এখন প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। কংগ্রেস, তৃণমূল-সহ একাধিক বিরোধী দল ইতিমধ্যেই কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বুধবারের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্টের পর সেই আক্রমণের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হল সিপিআইএমও।



