১ ভোট পেলেন বিজেপি প্রার্থী, চমকে দিল সিপিআইএম! রাজস্থান পুরভোটের সার্বিক ফল কী বলছে?

রাজস্থান পুরভোটে বিজেপি সবচেয়ে বেশি ওয়ার্ড জিতলেও নোখায় ৪৫টির মধ্যে ২৯টি দখল করেছে সিপিএম। নির্দলদের শক্তিশালী ফল ও এক বিজেপি প্রার্থীর এক ভোটও নজর কেড়েছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রাজস্থানের পুরভোটে বিজেপি সবচেয়ে বেশি ওয়ার্ড জিতেছে ঠিকই, কিন্তু ফলাফলে একাধিক জায়গায় দেখা গিয়েছে ভিন্ন ছবি। কোথাও নির্দলরা বড় শক্তি হয়ে উঠেছেন, কোথাও কংগ্রেস বিজেপিকে টক্কর দিয়েছে, আবার বিকানের জেলার নোখা পুরসভায় ৪৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি জিতে বোর্ড গঠনের অবস্থানে পৌঁছেছে সিপিআইএম (CPI-M)। আর পর্বতসরের একটি ওয়ার্ডে বিজেপি প্রার্থী কৈলাসচাঁদের প্রাপ্তি মাত্র ১ ভোট

রাজস্থান পুরভোটের প্রায় সম্পূর্ণ ফলাফল সামনে আসার পর দেখা যাচ্ছে, ১০,২৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০,২৩৫টির ফল ঘোষণা হয়েছে। এর মধ্যে বিজেপি জিতেছে ৪,১৭৯টি ওয়ার্ডে। কংগ্রেসের দখলে গিয়েছে ৩,৬১৩টি ওয়ার্ড। তৃতীয় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে নির্দলরা—তাঁদের জয় ২,২৭৩টি ওয়ার্ডে। অর্থাৎ বিজেপি সবচেয়ে বড় দল হলেও রাজ্যের পুর-রাজনীতির পুরো নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যায়নি।

এই ফলের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, পুরসভা বা পুর পরিষদের বোর্ড গঠনের অঙ্ক আর শুধুমাত্র বিজেপি বনাম কংগ্রেসে আটকে নেই। বহু জায়গায় নির্দল প্রার্থীদের জয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বদলে দিয়েছে। ফলে যেখানে কোনও দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, সেখানে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচনে নির্দল কাউন্সিলরদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। [মরুরাজ্যে লাল ঝড়, রাজস্থানে পুরভোটে ‘বাম’ বিড়ম্বনায় বিজেপি, AAP-এর চাপে ব্যাকফুটে কংগ্রেসও]

নোখার ফল অবশ্য এই সামগ্রিক ছবির মধ্যেও আলাদা করে নজর কেড়েছে। বিকানের জেলার নোখা পুরসভায় মোট ৪৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টিতে জয় পেয়েছে সিপিআইএম। বিজেপি পেয়েছে ১৩টি এবং নির্দল প্রার্থীরা তিনটি ওয়ার্ডে জিতেছেন। কংগ্রেস সেখানে একটি ওয়ার্ডও জিততে পারেনি। ২৯টি আসন নিয়ে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বোর্ড গঠনের অবস্থানে রয়েছে বামেরা।

গতকালের প্রতিবেদনে নোখায় সিপিএমের এই সাফল্যকে সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু রাজস্থান পুরভোটের সামগ্রিক ফল সামনে আসার পর দেখা যাচ্ছে, নোখার জয়টি শুধু একটি পুরসভার ফল নয়—রাজ্যের স্থানীয় রাজনীতিতে বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে অন্য রাজনৈতিক শক্তির জায়গা তৈরির সম্ভাবনাও সামনে এনেছে।

এ বারের নির্বাচনে সিপিআইএম রাজস্থানজুড়ে ১৯২ জন প্রার্থী দিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০ জন জয়ী হয়েছেন বলে প্রকাশিত ফল ও দলীয় বক্তব্যে উঠে এসেছে। অর্থাৎ রাজ্যজুড়ে সংখ্যার বিচারে দলটি বিজেপি বা কংগ্রেসের কাছাকাছি না থাকলেও, নোখায় ২৯টি ওয়ার্ডের জয় তাদের ফলাফলের গুরুত্ব অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে, পর্বতসর পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ফলও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সেখানে বিজেপির প্রার্থী কৈলাসচাঁদ পেয়েছেন মাত্র একটি ভোট। কংগ্রেসের হিনা খানাম ৩৭৬ ভোট পেয়ে ওই ওয়ার্ডে জয়ী হয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা নির্দল প্রার্থী রশিদ খান পেয়েছেন ১৯৫ ভোট।

এক ভোট পাওয়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন কৈলাসচাঁদ। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর নিজের ভোট ১২ নম্বর ওয়ার্ডে, অথচ তাঁকে বিজেপি ১৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রার্থী করেছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের একজন ভোটার তাঁকে ভোট দিয়েছেন। এই তথ্য তাঁর নিজের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে; এর বাইরে প্রার্থী বাছাইয়ের কারণ সম্পর্কে কোনও অনুমান করার প্রয়োজন নেই।

পর্বতসরেও কংগ্রেসের ফল উল্লেখযোগ্য। ২৫টি ওয়ার্ডের পুরসভাটিতে কংগ্রেস ১৩টি আসন জিতে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, বিজেপি পেয়েছে ১২টি। ফলে মাত্র একটি ওয়ার্ডের ব্যবধানেই সেখানে বোর্ড গঠনের অঙ্ক নির্ধারিত হয়েছে।

বড় পুরনিগমগুলির ফলেও একই সঙ্গে বিজেপির শক্তি এবং কংগ্রেসের পাল্টা লড়াই—দুই ছবিই দেখা গিয়েছে। জয়পুর, কোটা ও আলওয়ারে বিজেপি সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে বিকানের, আজমের ও পালিতে কংগ্রেস ভালো ফল করেছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঝলওয়ারেও কংগ্রেসের ফল বিজেপির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছে।

আজমেরে কংগ্রেস ৮০টির মধ্যে ৩৭টি ওয়ার্ড জিতেছে, বিজেপির দখলে ৩২টি। পালিতেও কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে। আবার জোধপুরে বিজেপি ও কংগ্রেস ৪৪টি করে ওয়ার্ড জেতায় সেখানে নির্দল ১০ কাউন্সিলরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও বড় চমক এসেছে ভরতপুরে। মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মার রাজনৈতিক ঘাঁটির এই এলাকায় ৬৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে নির্দল প্রার্থীরা জিতেছেন ৩৬টিতে। বিজেপি পেয়েছে ২০টি এবং কংগ্রেস মাত্র ৭টি। ফলে এই ফলও দেখাচ্ছে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় সমীকরণ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শুধু সিপিএম নয়, আম আদমি পার্টিও একটি পুরসভায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। বারান পুর পরিষদে ৬০টির মধ্যে ৩১টি ওয়ার্ড জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে আপ। কংগ্রেস পেয়েছে ১৮টি, বিজেপি ৯টি এবং নির্দলরা ২টি আসন। ফলে রাজস্থানের পুরভোটে বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে অন্য দলগুলিরও স্থানীয় স্তরে জায়গা তৈরির ছবি স্পষ্ট হয়েছে।

সব মিলিয়ে রাজস্থান পুরভোটের ফলকে এক কথায় বিজেপির একতরফা জয় বলা কঠিন। ৪,১৭৯টি ওয়ার্ডে জয় নিয়ে বিজেপি অবশ্যই সবচেয়ে বড় দল। কিন্তু কংগ্রেসের ৩,৬১৩টি জয়, নির্দলদের ২,২৭৩টি আসন এবং নোখায় সিপিআইএমের ২৯টি ওয়ার্ডের দখল—এই তিনটি সংখ্যা দেখাচ্ছে, রাজ্যের স্থানীয় রাজনীতির ছবিটি অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, ৩০৯টি নগর স্থানীয় সংস্থার মধ্যে বিজেপি ১৪৮টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বলে চূড়ান্ত ফলের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে ১০৪টিতে এবং ১০টি সংস্থায় দুই দল সমান অবস্থানে রয়েছে। ফলে বহু জায়গায় বোর্ডের পরবর্তী অঙ্ক নির্ভর করবে স্থানীয় সমীকরণ ও কাউন্সিলরদের সমর্থনের উপর।

এই কারণেই রাজস্থান পুরভোটের ফলের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত শুধু কে কত ওয়ার্ড জিতল, তা নয়। বিজেপি রাজ্যে নিজেদের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ধরে রাখলেও, নোখায় সিপিএমের ২৯টি ওয়ার্ড, বারানে আপের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং একাধিক পুরসভায় নির্দলদের শক্তিশালী উপস্থিতি দেখিয়ে দিল—স্থানীয় রাজনীতিতে বিজেপি-কংগ্রেসের বাইরেও ভোটারদের পছন্দের জায়গা রয়েছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন