মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানোর দাবিতে বিরোধীরা নতুন করে সরব। নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্য, এসআইআর নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তি এবং একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরেই তাঁকে অপসারণের দাবি জোরাল হয়েছে। কিন্তু এই অভিযোগগুলি কি সংবিধানের মাপকাঠিতে একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর জন্য যথেষ্ট? প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগির বক্তব্য, না।
এক সাক্ষাৎকারে রোহতগি দাবি করেছেন, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি সামনে এসেছে, সেগুলির ভিত্তিতে ইমপিচমেন্টের কোনও সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়নি। তাঁর যুক্তি, নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত যদি নিয়ম মেনে নেওয়া হয়, শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ আপত্তি বা মতবিরোধকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে দেখা যায় না।
বিতর্কের সূত্রপাত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনের পর। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সন্ধু এবং বিবেক জোশি অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রক্রিয়া নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। এসআইআর, ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন-বিয়োজন এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে তাঁদের আপত্তির কথা ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এই পরিস্থিতিতেই জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবি সামনে এসেছে। কিন্তু রোহতগি প্রশ্ন তুলেছেন, দুই কমিশনারের সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের মতপার্থক্য থাকা মানেই কি তাঁর বিরুদ্ধে সাংবিধানিক ভাবে ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’ প্রতিষ্ঠিত হয়?
রোহতগির ব্যাখ্যা, নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারও অন্য দুই কমিশনারের থেকে ভোটের ক্ষেত্রে বেশি ক্ষমতার অধিকারী নন। তিন জনের প্রত্যেকের ভোটের মূল্য সমান। ফলে কোনও বিষয়ে দুই কমিশনার একমত না হলে তাঁরা নিজেদের মত নথিভুক্ত করতে পারেন এবং প্রয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এখানেই এসআইআর নিয়ে চলতি বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসছে। কমিশনের সাম্প্রতিক অবস্থান অনুযায়ী, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ভাবেই নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তিন কমিশনারের সম্মতি ছিল—এমনটাই কমিশনের বক্তব্য।
রোহতগির যুক্তি, কোনও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আলোচনার সময় মতপার্থক্য থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। বরং ভিন্ন মত নথিভুক্ত করার সুযোগ থাকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ। তিনি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চের তুলনাও টেনেছেন। একাধিক বিচারপতির বেঞ্চে মতপার্থক্য হতে পারে, এমনকি প্রধান বিচারপতিও কোনও মামলায় সংখ্যালঘু মতের পক্ষে থাকতে পারেন। তাই শুধু মতপার্থক্য থেকেই অসদাচরণের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না বলে তাঁর বক্তব্য।
রোহতগি এ ক্ষেত্রে সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছেন। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরানো যায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের মতো একই পদ্ধতি এবং একই ধরনের ভিত্তিতে। অর্থাৎ, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’ বা ‘অক্ষমতা’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াতেও ‘proved misbehaviour or incapacity’-এর প্রয়োজন হয়। সংসদের যে কোনও কক্ষে অপসারণের প্রস্তাব আনার জন্য লোকসভায় অন্তত ১০০ জন এবং রাজ্যসভায় অন্তত ৫০ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন। প্রস্তাব গৃহীত হলে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত দুই কক্ষেই প্রয়োজনীয় বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া পর্যন্ত অপসারণ কার্যকর হয় না।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক ভাবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং সাংবিধানিক ভাবে তাঁকে পদ থেকে সরানোর মতো ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’ প্রতিষ্ঠিত হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়। জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কে রোহতগির বক্তব্য মূলত এই পার্থক্যটির উপরেই দাঁড়িয়ে।
তবে তাঁর বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তিগুলির কোনও গুরুত্ব নেই। দুই কমিশনার যে একাধিক বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, সেই তথ্য সামনে এসেছে। এসআইআর সংক্রান্ত Form 6, ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন ও বাদ দেওয়া এবং কমিশনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। সেই সিদ্ধান্তগুলির বৈধতা বা প্রশাসনিক যৌক্তিকতা নিয়ে আলাদা বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু রোহতগির বক্তব্য অনুযায়ী, সেই বিতর্ককে সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ‘অসদাচরণ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও নির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য ভিত্তি প্রয়োজন।
আর একটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রোহতগি। দুই নির্বাচন কমিশনারের তরফে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তাঁর মতে, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্যাবিনেট সচিব কেন্দ্রীয় প্রশাসনের শীর্ষ আমলা। তাই কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে তাঁর কাছে চিঠি পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল।
একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চিঠি বা নোট সংবাদমাধ্যমে কী ভাবে প্রকাশ্যে এল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রোহতগি। তাঁর বক্তব্য, নথিগুলি কী ভাবে বাইরে এল এবং সেগুলির কতটা সম্পূর্ণ ভাবে প্রকাশিত হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
এ দিকে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি শুধু রাজনৈতিক পরিসরেই আটকে নেই। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টেও আবেদন করা হয়েছে বলে রিপোর্ট এসেছে। একটি আবেদনে এসআইআর সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্তকে ‘একতরফা’ এবং ‘অননুমোদিত’ বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্য দিকে নির্বাচন কমিশন বরাবরই জানিয়েছে, এসআইআর সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিন কমিশনারের সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছে।
ফলে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্ক এখন দুটি আলাদা প্রশ্নে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে যে মতপার্থক্যের কথা সামনে এসেছে, তার প্রশাসনিক ও আইনগত গুরুত্ব কতটা। দ্বিতীয়ত, সেই মতপার্থক্য কি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুযায়ী মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের ভিত্তি হতে পারে?
প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগির উত্তর স্পষ্ট—শুধু এই অভিযোগগুলির ভিত্তিতে তা বলা যায় না। তাঁর মতে, কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’-এর সাংবিধানিক মানদণ্ড—দুটিকে আলাদা করে দেখতে হবে।



