দেশে রান্নার গ্যাসের গ্রাহক সংখ্যা আচমকাই কমে গেল। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিলের শুরু থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু—এই পাঁচ মাসে দেশে সক্রিয় LPG গ্রাহকের সংখ্যা কমেছে ৬২ লক্ষেরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরে যে LPG গ্রাহক সংখ্যা ধারাবাহিক ভাবে বাড়ছিল, এই প্রথম সেই প্রবণতায় বড় বদল দেখা গেল।
মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষের শুরুতে, অর্থাৎ এপ্রিলের গোড়ায় দেশে সক্রিয় গার্হস্থ্য LPG সংযোগ ছিল প্রায় ৩৩.৩৯ কোটি। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সেই সংখ্যা নেমে হয়েছে ৩২.৭৭৫ কোটি। অর্থাৎ পাঁচ মাসে কমেছে প্রায় ৬২ লক্ষ সংযোগ। সরকারি Petroleum Planning & Analysis Cell (PPAC)-এর ১ সেপ্টেম্বরের তথ্যেও সক্রিয় গার্হস্থ্য LPG সংযোগের সংখ্যা ৩২৭৭.৫০ লক্ষ দেখানো হয়েছে।
গত এক দশকের ছবির সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের বড় ফারাক রয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষের শুরুতে দেশে সক্রিয় LPG গ্রাহক ছিলেন প্রায় ১৪.৮৬ কোটি। তারপর থেকে ধারাবাহিক ভাবে বেড়ে চলেছিল সেই সংখ্যা। চলতি অর্থবর্ষের শুরুতেই তা ৩৩.৩৯ কোটিতে পৌঁছয়। অর্থাৎ এক দশকে সক্রিয় LPG গ্রাহকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছিল।
কেন হঠাৎ এই পতন? সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে LPG সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা এর অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে LPG-র দাম বৃদ্ধি। পশ্চিম এশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থার উপর ভারতের নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের LPG বাজারেও।
সরবরাহ পরিস্থিতির চাপের মধ্যে তেল বিপণন সংস্থাগুলি নতুন LPG সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করেছে। একই সঙ্গে পুরনো সংযোগগুলির ক্ষেত্রেও যাচাই শুরু হয়েছে। আধার-ভিত্তিক বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় গ্রাহক, একই পরিবারের একাধিক সংযোগ এবং ইতিমধ্যেই পাইপলাইনের মাধ্যমে PNG পাওয়া পরিবারগুলিকে চিহ্নিত করা হচ্ছে বলে শিল্পমহলের সূত্রে জানা গিয়েছে।
LPG গ্রাহক কমার পিছনে অবশ্য শুধু সরবরাহের সমস্যা কাজ করছে না। যেসব এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে PNG পৌঁছে গিয়েছে, সেখানে গ্রাহকদের LPG থেকে PNG-তে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। চলতি অর্থবর্ষে জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৬ লক্ষ নতুন PNG গ্রাহক যুক্ত হয়েছেন। মোট PNG গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১.৭৫ কোটি।
তবে LPG থেকে PNG-তে স্থানান্তরিত হওয়া গ্রাহকের সংখ্যা মোট পতনের তুলনায় অনেকটাই কম। হিসাব অনুযায়ী, LPG গ্রাহক কমার প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগের মতো PNG-তে স্থানান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ বাকি বড় অংশের পিছনে রয়েছে সংযোগ যাচাই, নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট এবং সরবরাহ পরিস্থিতির মতো একাধিক কারণ।
এই পতনের প্রভাব পড়েছে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনাতেও। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ মাসে উজ্জ্বলা যোজনার সক্রিয় গ্রাহক প্রায় ৬ লক্ষ কমেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে এই প্রকল্পের সক্রিয় সংযোগের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০.৫৭ কোটি।
আঞ্চলিক হিসাবেও LPG সংযোগ কমার ছবিতে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মার্চের শেষের তুলনায় দক্ষিণ ভারতে সক্রিয় LPG গ্রাহক কমেছে প্রায় ২৬.৩ লক্ষ। পশ্চিম ভারতে কমেছে প্রায় ১৬.২ লক্ষ এবং উত্তর ভারতে প্রায় ১৫ লক্ষ। পূর্ব ভারতে কমেছে প্রায় ৩.৪ লক্ষ। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে দক্ষিণ ভারতে, আর সবচেয়ে কম পূর্ব ভারতে।
তবুও সেপ্টেম্বরের শুরুতে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি LPG গ্রাহক রয়েছে উত্তর ভারতেই—প্রায় ৯.৯৩ কোটি। দক্ষিণ ভারতে সক্রিয় গ্রাহক প্রায় ৭.৯৮ কোটি, পশ্চিম ভারতে ৬.৮৩ কোটি এবং পূর্ব ভারতে ৬.৭৫ কোটি।
এর মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ভারতের LPG ব্যবহারের পরিমাণ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দেশে LPG ব্যবহার হয়েছিল প্রায় ৩.১৩ কোটি টন, যা তার আগের অর্থবর্ষের ২.৯৭ কোটি টনের তুলনায় বেশি। কিন্তু দেশের নিজস্ব উৎপাদন সেই হারে বাড়েনি। ফলে চাহিদা মেটাতে আমদানির উপর নির্ভরতা বজায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনে LPG গ্রাহক সংখ্যার গতিপথ কোন দিকে যায়, তা নজরে থাকবে। কারণ LPG সংযোগ কমার সঙ্গে একদিকে যেমন সরবরাহ ও যাচাইয়ের বিষয়টি যুক্ত, অন্য দিকে PNG-র প্রসার এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতিও তার উপর প্রভাব ফেলছে।
আর একটি বিষয়ও সামনে এসেছে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ১ অক্টোবরের পর LPG সংযোগের সঙ্গে আধার-ভিত্তিক e-KYC সম্পূর্ণ না থাকলে সিলিন্ডার কিনতে বেশি দাম দিতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরের মাসে সক্রিয় LPG সংযোগের সংখ্যা আরও কিছুটা কমতে পারে বলেও ওই মহলের মত।
অর্থাৎ, এক দশক ধরে বাড়তে থাকা LPG গ্রাহকভিত্তিতে এবার যে পতন দেখা গেল, তার পিছনে শুধুমাত্র রান্নার গ্যাসের চাহিদা কমে যাওয়া নয়—সরবরাহ পরিস্থিতি, সংযোগ যাচাই, LPG-র দাম, PNG-তে স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সবক’টি কারণই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



