প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে বাংলার ইতিহাস ও গৌরব তুলে ধরার মুহূর্তেই ফের বিতর্ক। দিল্লির কর্তব্যপথে কুচকাওয়াজ চলাকালীন বাংলার ট্যাবলো বর্ণনার সময় বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা-র নাম উচ্চারণে বিভ্রাট ঘটালেন ঘোষিকা। সেই মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে শোরগোল। ‘বঙ্কিমদা’ বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই ফের বাংলার মনীষীদের নামোচ্চারণ ঘিরে প্রশ্ন উঠল জাতীয় মঞ্চে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে শোনা যায়, পশ্চিমবঙ্গের ট্যাবলো সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়ার সময় ঘোষিকার মুখে মাতঙ্গিনী হাজরার নাম বিকৃত হয়ে উচ্চারিত হয় ‘মান্তাগিনী হাজরা’ হিসেবে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রথম শহীদ বীরাঙ্গনার নাম এইভাবে ভুল উচ্চারণ হওয়ায় অনেকেই একে অপমান বলে দেখছেন।


রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পরেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণে নামেন কলকাতা দক্ষিণের তৃণমূল সাংসদ মালা রায়। তাঁর কটাক্ষ,
“এরা ইতিহাস পড়ে না, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবনীও পড়ে না। মানুষকে ভুল বুঝিয়ে সরকারে বসেছে। যা বিদ্যে-বুদ্ধি আছে, সেটাই তো প্রকাশ পাবে। এটা মাতঙ্গিনী হাজরার অপমান।”
মালা রায়ের আরও মন্তব্য, যিনি এই উচ্চারণ করেছেন, তিনি ‘অশিক্ষিত নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে একই ব্র্যাকেটে পড়বেন’—এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বেড়েছে।
এই প্রথম নয় বিতর্ক
উল্লেখযোগ্যভাবে, রাজধানীতে মাতঙ্গিনী হাজরাকে ঘিরে বিতর্ক এই প্রথম নয়। এর আগে স্বাধীনতা সংগ্রামের এই বীরাঙ্গনাকে মুসলিম তকমা দিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সাংসদ দীনেশ শর্মা। সেই মন্তব্য নিয়ে বাংলার বিজেপি শিবিরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। তীব্র প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিরোধী নেতা।


‘বঙ্কিমদা’ বিতর্কের রেশ
বাংলার মনীষীদের নামোচ্চারণ নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে সবচেয়ে বড় বিতর্কে জড়ান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আলোচনার শুরুতেই সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-কে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন তিনি। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়-সহ বাংলার সাংসদদের আপত্তির পর সংশোধন করা হলেও বিতর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বাংলার ট্যাবলোয় কী ছিল?
এ বারের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজের থিম ছিল ‘স্বতন্ত্র কা মন্ত্র: বন্দে মাতরম’। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পাঠানো ট্যাবলোয় তুলে ধরা হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার ঐতিহাসিক ভূমিকা। সামনের সারিতে ছিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মডেল—খাগের কলম দিয়ে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ‘বন্দে মাতরম’ লিখছেন তিনি।
ট্যাবলোয় সমান মাপে স্থান পেয়েছিলেন ঘোড়ার পিঠে চড়া আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু, জাতীয় পতাকা হাতে মাতঙ্গিনী হাজরা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানো ক্ষুদিরাম বসু। পাশাপাশি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর ব্রিটিশ অত্যাচারের দৃশ্যও তুলে ধরা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে, ইতিহাস ও গৌরবের এই উপস্থাপনার মাঝেই ঘোষিকার এক মুহূর্তের উচ্চারণ বিভ্রাট নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল—জাতীয় মঞ্চে আঞ্চলিক ইতিহাস ও মনীষীদের যথাযথ সম্মান কি সত্যিই নিশ্চিত?







