নজরবন্দি ব্যুরো: ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হওয়ার মধ্যেই মুখ খুললেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। রাঁচীতে বিধানসভা অভিযানের সময় পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার ঘটনায় তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার পড়ুয়াদের রয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করা ঠিক হয়নি।
রাহুলের বক্তব্য, যে কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ঝাড়খণ্ডের পড়ুয়াদের সমস্যার সমাধান পুলিশের শক্তি প্রয়োগ করে নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমেই করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি ঝাড়খণ্ড সরকারকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গিয়ে তাঁদের সমস্যার দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
ঘটনার জেরে অবশ্য নতুন করে রাজনৈতিক অস্বস্তিতে পড়েছে কংগ্রেস। কারণ ঝাড়খণ্ডে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের (Hemant Soren) নেতৃত্বাধীন জেএমএম-কংগ্রেস জোট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। ফলে যে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে রাহুল গান্ধী প্রকাশ্যে পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করছেন, সেই আন্দোলন সামলানোর দায় বর্তাচ্ছে তাঁরই জোটসঙ্গী সরকারের উপর। এ কারণেই রাহুলের মন্তব্যকে রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সোমবার রাঁচীতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় JPSC ও JSSC-র নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে ডাকা ‘বিধানসভা ঘেরাও’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। হাজার হাজার পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থী বিধানসভার দিকে এগোতে শুরু করলে একাধিক স্তরে ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ব্যারিকেড অতিক্রম করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। পরে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনাও সামনে আসে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে একাধিক অনিয়মের কারণে পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাঁদের অন্যতম প্রধান দাবি, অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং প্রয়োজনে সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে হবে। বর্তমানে অভিযোগগুলির তদন্ত করছে ঝাড়খণ্ড সিআইডি। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আন্দোলনকারীদের একাধিক দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
রবিবার সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠকের পর রাজ্যের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, পড়ুয়াদের প্রায় ৯৮ শতাংশ দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা সেই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন। বিশেষ করে সিবিআই তদন্তের দাবি নিয়ে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে আলোচনা হলেও আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি।
এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো (Devendranath Mahto)। নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে তিনি অনশনেও বসেছেন। সোমবারের বিধানসভা অভিযানে তাঁর উপস্থিতি আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয়। একাধিক ব্যারিকেড অতিক্রম করে আন্দোলনকারীরা বিধানসভার দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘাত তৈরি হয়।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের তাৎপর্য আরও বাড়ছে সাম্প্রতিক জাতীয় স্তরের ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। গত কয়েক সপ্তাহে পরীক্ষা, প্রশ্নফাঁস এবং নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন হয়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনেও রাহুল সরাসরি পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন।
সেই অবস্থান থেকেই ঝাড়খণ্ডের ঘটনাতেও রাহুলের বক্তব্যকে দেখছে কংগ্রেস। তবে রাজনৈতিক প্রশ্নও উঠছে—কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে যে কড়া অবস্থান নেয় কংগ্রেস, জোটসঙ্গী শাসিত রাজ্যে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে দল কতটা সক্রিয় হবে? রাহুল অবশ্য আপাতত আন্দোলনকারীদের দাবি শোনা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের উপরেই জোর দিয়েছেন।
এদিকে রাঁচীর পরিস্থিতি সোমবার সন্ধ্যাতেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আন্দোলনকারীদের বিধানসভা চত্বরে ঢোকার চেষ্টা এবং পুলিশের বাধা ঘিরে উত্তেজনা বজায় ছিল বলে রিপোর্টে জানা যাচ্ছে। ফলে এখন নজর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফের আলোচনায়। রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি পড়ুয়াদের ক্ষোভ কীভাবে সামাল দেওয়া যায়, সেটিই হেমন্ত সোরেন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা।



