ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বড় অঙ্কের নগদ টাকা জমা। স্বাভাবিকভাবেই আয়কর দফতরের নজরে আসে লেনদেন। এরপরই বেঙ্গালুরুর এক কৃষককে পাঠানো হয় Income Tax Notice। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, ব্যাঙ্কে জমা হওয়া টাকার উৎস যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। কিন্তু কৃষকের দাবি ছিল, ওই টাকা কোনও অঘোষিত আয় নয়—জমিতে ফলানো সবজি ও ফল বিক্রি করে পাওয়া কৃষিজ আয়।
শেষ পর্যন্ত সেই দাবির পক্ষে জমির নথি, APMC-তে কৃষিজ পণ্য বিক্রির বিল এবং ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্ট পেশ করেন তিনি। বিষয়টি যায় আয়কর আপিল ট্রাইব্যুনাল (Income Tax Appellate Tribunal বা ITAT), বেঙ্গালুরুতে। ২৮ আগস্ট ২০২৬-এর রায়ে ট্রাইব্যুনাল কৃষকের বক্তব্য মেনে নেয় এবং Section 69A-র অধীনে ওই অর্থকে ‘unexplained money’ হিসেবে দেখানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করে।
ঘটনাটি বেঙ্গালুরুর গ্রামীণ এলাকার দোদ্দাবল্লাপুরের। করদাতার প্রায় ৪ একর ৪ গুন্টা কৃষিজমি ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই জমিতে ফল ও সবজি চাষ করে তিনি সেগুলি দোদ্দাবল্লাপুরের APMC Yard-এ বিক্রি করতেন। বিক্রি থেকে পাওয়া নগদ টাকা পরবর্তী সময়ে তাঁর SBI ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়।
সমস্যা তৈরি হয় ব্যাঙ্কে ওই নগদ জমার পর। আয়কর দফতর লেনদেনটি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ, তাঁর ITR-এ ওই কৃষিজ আয়ের উল্লেখ ছিল না। একই সময়ে সম্পত্তি কেনাবেচার লেনদেনও আয়কর বিভাগের নজরে আসে। যদিও সম্পত্তি সংক্রান্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়েছিল, নগদ জমার উৎস নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
কৃষক আয়কর কর্তৃপক্ষের সামনে জানান, ব্যাঙ্কে জমা হওয়া নগদ মূলত কৃষিজ পণ্য বিক্রি থেকে পাওয়া টাকা। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি জমির RTC ও pahani records, APMC-র বিক্রির বিল এবং ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট জমা দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, কৃষিজ আয় সাধারণভাবে করমুক্ত হওয়ায় তিনি ভুলবশত ITR-এ সেই আয়ের উল্লেখ করেননি।
কিন্তু আয়কর আধিকারিক সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি। তাঁর যুক্তি ছিল, জমির RTC-তে কোন ফসল চাষ করা হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। কৃষিকাজে ব্যবহৃত বীজ, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণের কেনাকাটার বিস্তারিত বিলও করদাতা দেখাতে পারেননি। আগের বছর এবং পরের বছরেও ITR-এ কৃষিজ আয়ের উল্লেখ না থাকায় তাঁর দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
এরপর ব্যাঙ্কে জমা হওয়া অর্থকে আয়কর আইনের Section 69A-এর অধীনে ‘unexplained money’ হিসেবে গণ্য করা হয়। Commissioner of Income Tax (Appeals)-এর কাছ থেকেও কৃষক স্বস্তি পাননি। শেষ পর্যন্ত ITAT বেঙ্গালুরুর দ্বারস্থ হন তিনি।
ট্রাইব্যুনাল অবশ্য নথিগুলি খতিয়ে দেখে অন্য সিদ্ধান্তে পৌঁছয়। ITAT-এর সামনে থাকা নথির মধ্যে ছিল জমির সরকারি রেকর্ড, কৃষিজ পণ্য বিক্রির মাসিক হিসাব, APMC-র sale bills এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের লেনদেনের তথ্য।
ITAT-এর যুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, RTC-তে নির্দিষ্ট ফসলের উল্লেখ না থাকলেই যে ওই জমিতে কৃষিকাজ হয়নি, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। ওই জমির সরকারি রেকর্ড রয়েছে এবং APMC-র মতো সরকারি নিয়ন্ত্রিত বাজারে কৃষিজ পণ্য বিক্রির নথিও রয়েছে। ফলে শুধু এই ঘাটতির ভিত্তিতে কৃষকের বক্তব্য পুরোপুরি বাতিল করা যায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, APMC-র বিক্রির বিলগুলি কোনও ব্যক্তিগত কাগজ নয়। APMC হল রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রিত কৃষি বিপণন ব্যবস্থার অংশ। ওই নথিতে কৃষিজ পণ্য বিক্রির তথ্য ছিল এবং সেই বিক্রির টাকা পরে ব্যাঙ্কে জমা হয়েছে—এই যোগসূত্রটিকেই ITAT গুরুত্ব দিয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল আরও বলেছে, আয়কর আধিকারিক চাইলে এই কৃষিজ পণ্য বিক্রির দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারতেন। APMC বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বিক্রির সত্যতা যাচাই করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই ধরনের কোনও কার্যকর স্বাধীন যাচাই করা হয়নি।
বীজ, কীটনাশক বা অন্যান্য কৃষি খরচের প্রতিটি বিল না থাকা নিয়েও ITAT বাস্তব পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেছে। ছোট পরিসরে কৃষিকাজ করা একজন কৃষকের কাছ থেকে প্রতিটি কৃষি উপকরণের বিস্তারিত ‘pucca’ হিসাব প্রত্যাশা করা সবসময় বাস্তবসম্মত নয় বলেই ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ করেছে।
আগের বছর ও পরের বছর ITR-এ কৃষিজ আয় দেখানো হয়নি—এই বিষয়টিও কৃষকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়নি। কৃষক জানিয়েছিলেন, করমুক্ত বলে তিনি ওই আয় ITR-এ দেখানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ভুল ধারণায় ছিলেন। ITAT মনে করেছে, অন্য নথিতে যখন কৃষিকাজ ও নগদের উৎসের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে, তখন শুধু আগের রিটার্নে আয় উল্লেখ না করার কারণে তাঁর পুরো ব্যাখ্যা বাতিল করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত ITAT বেঙ্গালুরু কৃষকের দেওয়া নথি গ্রহণ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়, সংশ্লিষ্ট নগদ জমাকে Section 69A-এর অধীনে unexplained money হিসেবে গণ্য করা যাবে না। ফলে ওই সংযোজন বাতিল হয় এবং কৃষক মামলায় স্বস্তি পান।
তবে এই রায়ের অর্থ ব্যাঙ্কে নগদ টাকা জমা করলেই আয়কর নোটিস থেকে রেহাই—এমন নয়। এই মামলায় কৃষকের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নগদের উৎসের সঙ্গে যুক্ত নথিপত্র। জমির রেকর্ড, APMC sale bills এবং ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট মিলিয়ে তিনি দেখাতে পেরেছিলেন, টাকার উৎস কৃষিজ পণ্য বিক্রি। সেই documentary trail-ই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কৃষিজ আয় সাধারণভাবে করমুক্ত হলেও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ITR-এ তার disclosure-এর নিয়ম রয়েছে। এই মামলায় করদাতা তা না দেখানোর কারণ হিসেবে অজ্ঞতার কথা বলেছিলেন; ITAT সেটিকে একাই তাঁর দাবিকে বাতিল করার যথেষ্ট কারণ হিসেবে গ্রহণ করেনি।
অর্থাৎ, ব্যাঙ্কে নগদ জমা নিয়ে আয়কর দফতরের প্রশ্ন উঠলে টাকার উৎসের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলায় সেই প্রমাণ হিসেবে APMC-র বিল, জমির নথি এবং ব্যাঙ্কের লেনদেনের ধারাবাহিকতাই কৃষকের পক্ষে বড় ভূমিকা নিয়েছে।



