‘গরিবি হটাও’ শুধু স্লোগান নয়, ১২ বছরে ৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত! দাবি প্রধানমন্ত্রীর

বিশ্বব্যাঙ্কের অক্টোবর ২০২৬-এর রিপোর্ট তুলে ধরে ভারতে দারিদ্র কমার কৃতিত্ব নিজের সরকারের বলে দাবি করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বস্তারে দীপাবলির অনুষ্ঠানে ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান নিয়েও কংগ্রেসকে আক্রমণ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দারিদ্র দূরীকরণ নিয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলের ‘গরিবি হটাও’ স্লোগানকে খোঁচা দিয়ে বিরোধীদের নিশানা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। দীপাবলির সকালে ছত্তিশগড়ের বস্তারে দাঁড়িয়ে তাঁর দাবি, গত ১২ বছরে ভারতে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার বাইরে এসেছেন। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে বিশ্বব্যাঙ্কের (World Bank) সাম্প্রতিক রিপোর্টের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন তিনি। মোদির বক্তব্য, শুধু দারিদ্র দূর করার স্লোগান দিলেই হয় না, তার জন্য প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা এবং বাস্তব পদক্ষেপ।

দীপাবলি উপলক্ষে এবার ছত্তিশগড়ের বস্তারে সময় কাটান প্রধানমন্ত্রী। একসময় মাওবাদী কার্যকলাপের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে দাঁড়িয়ে মাওবাদ দমনে কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি আত্মনির্ভর ভারত এবং বিকশিত ভারতের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন।

- Advertisement -

বস্তারে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে দীপাবলি উদযাপনের মঞ্চ থেকেই মোদি বলেন, গত ১২ বছরে গরিব কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির গতি অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। তাঁর দাবি, আগের সরকারের আমলে দারিদ্র দূরীকরণ নিয়ে শুধু স্লোগান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করেছে। মোদির কথায়, “গরিবি হটাও স্লোগান দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়। সরকারের ইচ্ছাশক্তির উপর সব নির্ভর করে।”

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বিশ্বব্যাঙ্কের সদ্য প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া পোভার্টি অ্যান্ড ইক্যুইটি ব্রিফ’ (India Poverty and Equity Brief)। ২০২৬ সালের অক্টোবরের এই রিপোর্টে ভারতের দারিদ্র পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির কথা বলা হয়েছে। তবে রিপোর্টের পরিসংখ্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দাবির পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাঙ্কের রিপোর্টে ঠিক কী বলা হয়েছে?

বিশ্বব্যাঙ্কের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে দৈনিক ৪.২০ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্রসীমার নিচে থাকা মানুষের অনুপাত ৫৭.৭ শতাংশ থেকে কমে ১৬.১ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে আনুমানিক ৪৯.৬ কোটি মানুষ ওই দারিদ্রসীমার উপরে উঠে এসেছেন।

এই হিসাব করা হয়েছে ২০২১ সালের ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (Purchasing Power Parity বা PPP) অনুযায়ী। অর্থাৎ, ডলারের অঙ্ককে সরাসরি ভারতীয় টাকায় রূপান্তর করে এই দারিদ্রসীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

- Advertisement -

অন্যদিকে, অতি দারিদ্রের ক্ষেত্রে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক সীমা ব্যবহার করেছে বিশ্বব্যাঙ্ক। সেই হিসাবে ২০১১ সালে ভারতের ২৭.১ শতাংশ মানুষ অতি দারিদ্রের মধ্যে ছিলেন। ২০২৩ সালে সেই হার কমে দাঁড়িয়েছে ২.৬ শতাংশে। অর্থাৎ, দারিদ্র কমার পাশাপাশি অতি দারিদ্রের হারেও বড় পরিবর্তন এসেছে।

তবে দুটি পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ৪৯.৬ কোটি মানুষের দারিদ্রসীমার উপরে উঠে আসার হিসাবটি ৪.২০ ডলারের সীমার ভিত্তিতে। সেটিকে অতি দারিদ্র থেকে মুক্ত মানুষের সংখ্যা বলা ঠিক হবে না।

গ্রাম ও শহরের দারিদ্রের ছবিতে এখনও ফারাক

জাতীয় স্তরে দারিদ্রের হার কমলেও গ্রাম ও শহরের মধ্যে ব্যবধান এখনও রয়েছে। বিশ্বব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে ৪.২০ ডলারের দারিদ্রসীমা ধরে গ্রামাঞ্চলে দারিদ্রের হার ছিল ১৯.৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে সেই হার ৮.৬ শতাংশ।

অর্থাৎ, শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্রের সমস্যা এখনও অনেক বেশি। কর্মসংস্থান, আয়ের সুযোগ এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের চ্যালেঞ্জ যে পুরোপুরি কাটেনি, এই পরিসংখ্যান থেকেই তা স্পষ্ট।

আয়ের বৈষম্যও অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা। বিশ্বব্যাঙ্কের রিপোর্টে শ্রমবাজারের আয়ের ব্যবধানের কথাও উঠে এসেছে। ২০২৩-২৪ সালে উপরের ১০ শতাংশ উপার্জনকারীর মধ্যম আয় নিচের ১০ শতাংশের তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ বেশি ছিল।

গরিব কল্যাণ প্রকল্পের সাফল্যের কৃতিত্ব সরকারের

বস্তারের সভায় প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, সরাসরি উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, বিনামূল্যে রেশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, পাকা বাড়ি, শৌচালয় এবং রান্নার গ্যাসের মতো প্রকল্প দারিদ্র কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।

তাঁর বক্তব্য, সরকারের লক্ষ্য শুধু আর্থিক সাহায্য দেওয়া নয়, সাধারণ মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া। সেই কারণেই আত্মনির্ভর ভারত এবং বিকশিত ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্বব্যাঙ্কও দারিদ্র কমার পিছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের উল্লেখ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের প্রসার, বিশেষ করে মহিলাদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ এবং খাদ্য ভর্তুকির মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সম্প্রসারণ।

সব মিলিয়ে, বিশ্বব্যাঙ্কের নতুন রিপোর্টকে হাতিয়ার করে দারিদ্র দূরীকরণে নিজের সরকারের সাফল্য তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান নিয়ে কংগ্রেসের অতীত সরকারকেও নিশানা করলেন তিনি। তবে পরিসংখ্যান বলছে, দারিদ্র কমলেও গ্রামীণ দারিদ্র এবং আয়বৈষম্যের মতো সমস্যা এখনও ভারতের অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর