নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান: ৫০০ কোটি ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা, উদ্ধারকাজে ভারতের বড়সড় সাহায্য

নেপালের হড়পা বানে ভয়াবহ বিপর্যয়, মৃত ৬৬৯ এবং নিখোঁজ আড়াই হাজারের বেশি। পুনর্গঠনে ৫০০ কোটি ডলারের প্রয়োজনের আশঙ্কা, ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে বড় সাহায্য ভারতের।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বানে বিপর্যস্ত একাধিক এলাকা। লাফিয়ে বাড়ছে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা। সরকারি হিসাবে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৬৬৯-এ পৌঁছেছে, নিখোঁজ অন্তত আড়াই হাজার। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পুনর্গঠন ও ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে প্রাথমিক ভাবে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন নেপালের অর্থমন্ত্রী স্পর্ণিম ওয়াগলে। বিপদের দিনে প্রতিবেশী নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারতও—ত্রাণের পাশাপাশি বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরংয়ের অভিবাসন দপ্তর থেকেই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা স্পষ্ট। কৈলাস-মানসরোবর যাত্রার জন্য নথি যাচাই চলাকালীন আচমকাই হড়পা বান আছড়ে পড়ে বহুতল ওই অফিসের উপর। মুহূর্তের মধ্যে কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় গোটা এলাকা।

ঘটনার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা পেরিয়ে সেখানে পৌঁছয় চিনা উদ্ধারকারী দল। কিন্তু ধ্বংসস্তূপ ছাড়া প্রায় কিছুই মেলেনি। নুয়াকোট, ধাদিং, গোর্খা, তানাহুন, চিতওয়ান এবং নাওয়ালপারাসির মতো একাধিক এলাকাতেও একই ছবি।

টানা কয়েকদিন ধরে উদ্ধার অভিযান চললেও এখনও বহু মানুষের কোনও খোঁজ নেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা ৬৬৯। নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন অন্তত আড়াই হাজার মানুষ, যার মধ্যে প্রায় ৩২০ জন ভারতীয় নাগরিক। নেপালের বিভিন্ন এলাকায় এখনও চলছে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান।

কাঠমান্ডুর তরফে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শতাধিক আহত ও অসুস্থ ব্যক্তি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে একদিকে চলছে উদ্ধারকাজ, অন্যদিকে শুরু হয়েছে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব।

নেপালের অর্থমন্ত্রী স্পর্ণিম ওয়াগলের হিসাব অনুযায়ী, বিপর্যস্ত এলাকাগুলির পুনর্গঠন ও ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে প্রাথমিক ভাবে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই অঙ্ক নেপালের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশ। তবে তাঁর দাবি, ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের তুলনায় এবারের পুনর্গঠনের খরচ তুলনামূলক ভাবে কম হবে।

২০১৫ সালের ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই বিপর্যয়ের পরে দেশ পুনর্গঠনে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছিল। এবারের বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনও স্পষ্ট না হলেও প্রাথমিক হিসাবেই যে ধাক্কা বড়, তা পরিষ্কার।

তবে বিপর্যয়ের মধ্যেও ত্রাণের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির ছবি সামনে এসেছে। মাত্র তিন দিনের মধ্যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে প্রায় ২০০ কোটি ডলার জমা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় চলছে মৃতদেহ উদ্ধারের কাজ।

চিতওয়ান থেকে এখনও পর্যন্ত ২৪৮টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। পূর্ব নাওয়ালপারাসি থেকে ১৫৮টি, পশ্চিম নাওয়ালপারাসি থেকে ৭৫টি, গোর্খা থেকে ৫৪টি, ধাদিং থেকে ৪৯টি এবং নুয়াকোট থেকে ৪১টি দেহ উদ্ধারের খবর মিলেছে। অন্যদিকে নুয়াকোট থেকেই সবচেয়ে বেশি—১,৬২২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

উদ্ধার অভিযানে ভারতের ভূমিকাও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে চারজন ভারতীয় শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক। দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে আরও অভিযান চালানোর প্রস্তুতি চলছে।

বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর থেকেই নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে নয়াদিল্লি। ইতিমধ্যে ভারত থেকে প্রায় ৬২ টন ত্রাণসামগ্রী নেপালে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলকে অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে প্রথমে দ্বিধা থাকলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত বদল করে কাঠমান্ডু। এর পরেই শনিবার ভারতে থেকে বিশেষ উদ্ধারকারী দল নেপালে পৌঁছেছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে নেপালের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। সূত্রের খবর, প্রায় ১১টি হাইড্রো-পাওয়ার সাইটে এখনও টানেলের ভিতরে আটকে থাকতে পারেন প্রায় ৯০০ শ্রমিক। তাঁদের উদ্ধারে চিনের পাশাপাশি ভারতও বিশেষ দল পাঠাতে পারে বলে খবর।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের সাহায্যের জন্য নয়াদিল্লিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পোড়েল (Ram Chandra Paudel)। ‘সংহতি ও সহায়তা’-র জন্য ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি বিপর্যয়ে নিখোঁজ ভারতীয় নাগরিকদের পরিবারগুলির প্রতিও সহমর্মিতা জানিয়েছেন তিনি।

ভারতের তরফেও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh)। লখনউয়ের একটি অনুষ্ঠানে তিনি জানান, নেপালের এই বিপর্যয়কে ভারত আলাদা করে দেখছে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) নির্দেশ অনুযায়ী, নেপালকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

তবে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে বিপর্যয়ের আগাম সতর্কতা নিয়ে। নেপালের প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী মাধবপ্রসাদ চৌলাগাইন অভিযোগ করেছেন, প্রোটোকল থাকা সত্ত্বেও ভয়াবহ হড়পা বান আছড়ে পড়ার আগে চিনের তরফে কোনও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, সময়মতো তথ্য না পাওয়াই বিপর্যয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তুলনামূলক ভাবে কম ভয়াবহ একটি হিমবাহ-সংক্রান্ত বিপর্যয়ের পর ভারত-চিন সীমান্তবর্তী তথ্য আদান-প্রদানের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবারের ঘটনায় সেই তথ্য বিনিময় কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, এমন গুরুত্বপূর্ণ দুর্যোগ-সংক্রান্ত তথ্য আটকে রাখা বা যথাসময়ে না জানানো অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

এখন নেপালের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে দু’টি—একদিকে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজে উদ্ধার অভিযান চালানো, অন্যদিকে বিপর্যস্ত পরিকাঠামো পুনর্গঠন। সেই কঠিন সময়ে ভারতের ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা প্রতিবেশী দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে। তবে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত দাঁড়াবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর