ভুটানে হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ (Glacial Lake) ভেঙে নেমে এল বিপুল জলরাশি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উত্তর-পশ্চিম ভুটানের গাসা জেলায় শিন্টাফু হ্রদ থেকে জল বেরিয়ে আসার জেরে হড়পা বানের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক পরিকাঠামো। এই ঘটনার জেরে ভুটান থেকে নেমে আসা সঙ্কোশ নদীর জলস্তর বেড়ে উত্তরবঙ্গ ও অসমের কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সতর্কতা জারি করে প্রশাসনও। তবে আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম এলাকায় সঙ্কোশ নদীর জলস্তর উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ায় আপাতত স্বস্তিতে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই ভুটানের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছিলেন উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক আধিকারিকরা। শিন্টাফু হ্রদ থেকে বেরিয়ে আসা জল মো ছু নদীর জলস্তর বাড়িয়ে দেয়। এর জেরে গাসা জেলার জনপ্রিয় উষ্ণ প্রস্রবণ গাসা শাচু (Gasa Tshachu) সংলগ্ন পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কয়েকটি অস্থায়ী সেতুরও। পুনাখা-গাসা সড়কের একাংশও জলের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর।
ভুটানের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হড়পা বানের আগেই বিপজ্জনক এলাকা থেকে মানুষজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে এখনও পর্যন্ত সেখানে কোনও হতাহতের খবর নেই। তবে রাতের অন্ধকার এবং প্রবল জলস্রোতের কারণে ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ হিসাব পাওয়া যায়নি। শিন্টাফু হ্রদকে ভুটানের ১৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহসৃষ্ট হ্রদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই হ্রদ থেকে জল বেরিয়ে আসার ঘটনা নতুন নয়। ২০২১ সালের ২৬ অগস্টও শিন্টাফু হ্রদের জল উপচে মো ছু নদীতে ভয়াবহ হড়পা বান নেমেছিল। সেই সময় নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল গাসা শাচু উষ্ণ প্রস্রবণ। এবারের ঘটনায় ফের ওই অঞ্চলের পরিকাঠামো ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সঙ্কোশের জলস্তর নিয়ে নজরদারি, সরানো হয় বাসিন্দাদের
ভুটানের পরিস্থিতির খবর সামনে আসতেই উত্তরবঙ্গের সঙ্কোশ নদী তীরবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। বিশেষ করে আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম ব্লকের নদী সংলগ্ন গ্রামগুলিতে বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রশাসনের তরফে মাইকিং করে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। কেউ আশ্রয় নেন ত্রাণশিবিরে, আবার অনেকে নিরাপদ জায়গার খোঁজে জাতীয় সড়কের আশপাশে রাত কাটান।
বৃহস্পতিবার রাতে বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাঁও কুমারগ্রাম, চ্যাংমারি-সহ সঙ্কোশ নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আবেদন জানান। প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়। নদীর জলস্তর বাড়লে যাতে প্রাণহানি না ঘটে, সেই লক্ষ্যেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
শুক্রবার সকালে অবশ্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে খবর। কুমারগ্রাম এলাকায় সঙ্কোশ নদীর জলস্তর উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। কয়েকটি এলাকায় ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষজন বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে প্রশাসনের তরফে নজরদারি পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, বিপর্যয়ের আশঙ্কায় কয়েক হাজার মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্কুল, কমিউনিটি হল এবং অন্যান্য নিরাপদ ভবনকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরাও প্রস্তুত রয়েছেন।
উত্তরবঙ্গ ও অসমে সতর্কতা জারি
শুধু আলিপুরদুয়ার নয়, ভুটান থেকে নেমে আসা নদীগুলির জলস্তরের উপর নজর রাখা হচ্ছে জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং অসমের ধুবড়ি জেলাতেও। সঙ্কোশ নদীর জল আচমকা বেড়ে গেলে নদী তীরবর্তী বসতি, কৃষিজমি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ভুটানের হড়পা বান নিয়ে কেন্দ্রীয় জলসম্পদ সংক্রান্ত দপ্তর এবং রাজ্য প্রশাসনের তরফে নজরদারি চালানো হচ্ছে। নদীর গতিপ্রকৃতি ও জলস্তরের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে বাসিন্দাদের নদীর কাছে না যাওয়ার এবং কোনওরকম গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের বক্তব্য অনুযায়ী, যে কোনও আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। আপাতত সঙ্কোশের জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও ভুটানের পরিস্থিতি এবং নদীর গতিপ্রকৃতির উপর নজর রাখছেন আধিকারিকরা।



