অর্ক সানা: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭৬তম জন্মদিন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির উদ্যোগে ‘আশীর্বাদের প্রদীপ’ সহ একাধিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। তবে জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদির জীবনকে একবার ফিরে দেখলে সামনে আসে এমন এক দীর্ঘ পথচলা, যার শুরু গুজরাটের বডনগরের একটি সাধারণ পরিবারে, আর পরিণতি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে।
নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবনকে শুধুমাত্র ২০১৪ সালে দিল্লির ক্ষমতায় আসার জায়গা থেকে দেখলে তাঁর যাত্রার একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। তাঁর গল্পের ভিত তৈরি হয়েছিল অনেক আগে—শৈশব, পড়াশোনা, সংগঠনের কাজ, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং গুজরাটের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গুজরাটের মেহসানা জেলার বডনগরে জন্ম নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির। বাবা দামোদরদাস মূলচাঁদ মোদি এবং মা হীরাবেন মোদি। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর শৈশব কেটেছে বডনগরেই। পরিবারের চায়ের দোকানে বাবাকে সাহায্য করার অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তী জীবনে বহুবার বলেছেন মোদি।
সেই শৈশবের ছবির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বই পড়ার অভ্যাস এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহ। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, স্কুলজীবনে স্থানীয় লাইব্রেরিতে সময় কাটাতেন তিনি। স্বামী বিবেকানন্দের লেখা তাঁর চিন্তাভাবনায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল বলেও মোদি বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তাঁর জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় সংগঠনের মাধ্যমে। কৈশোরেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (Rashtriya Swayamsevak Sangh) সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে পূর্ণ সময়ের প্রচারক হিসেবে সংগঠনের কাজে যুক্ত হন। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সংগঠনের কাজ করা, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলানো—এই সময়েই তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতার ভিত তৈরি হয়।
নরেন্দ্র মোদির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও সরকারি নথিতে তথ্য রয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য বারাণসী কেন্দ্র থেকে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তিনি ১৯৭৮ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Bachelor of Arts এবং ১৯৮৩ সালে গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Master of Arts ডিগ্রি অর্জন করেন।
সংগঠনের কাজে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর ভারতীয় জনতা পার্টির (Bharatiya Janata Party) সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা বাড়তে থাকে। গুজরাট BJP-তে সংগঠনের দায়িত্ব থেকে শুরু করে জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব—ধীরে ধীরে তৈরি হয় তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি।
তারপর আসে ২০০১ সাল।
৭ অক্টোবর ২০০১ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সেই সময় গুজরাট একাধিক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। ওই বছরই ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল কচ্ছ-সহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রশাসনের সামনে ছিল পুনর্গঠন ও উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পরবর্তী প্রায় ১৩ বছর গুজরাটের প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন মোদি। এই সময়ে শিল্প, বিনিয়োগ, পরিকাঠামো, বিদ্যুৎ, সেচ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়কে তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে এই প্রশাসনিক মডেলই জাতীয় রাজনীতিতে ‘গুজরাট মডেল’ নামে পরিচিতি পায়।
তবে গুজরাট পর্ব শুধু উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্যই আলোচিত হয়নি। ২০০২ সালের সাম্প্রদায়িক হিংসা তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়ের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলির একটি হয়ে থাকে। এই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বহু বছর ধরে চলেছে। মোদি ও তাঁর সরকার এই অভিযোগগুলির বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে; একই সঙ্গে আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়াতেও বিষয়টি পর্যালোচিত হয়েছে। ফলে তাঁর গুজরাট পর্বকে মূল্যায়ন করতে গেলে উন্নয়ন ও প্রশাসনের পাশাপাশি এই বিতর্কিত অধ্যায়টিও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনায় রাখতে হয়।
২০১৩ সালে BJP-র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির নাম সামনে আসে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে BJP একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২৬ মে ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি।
সেখান থেকেই শুরু হয় জাতীয় রাজনীতিতে মোদি যুগের নতুন অধ্যায়।
প্রথম মেয়াদে তাঁর সরকারের অন্যতম পরিচিত উদ্যোগ ছিল প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা। ব্যাংকিং পরিষেবার বাইরে থাকা মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়। স্বচ্ছ ভারত অভিযান পরিচ্ছন্নতাকে জাতীয় কর্মসূচির পর্যায়ে নিয়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা দরিদ্র পরিবারের মহিলাদের রান্নার গ্যাসের সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই সময়েই আধার, জনধন অ্যাকাউন্ট এবং মোবাইল প্রযুক্তির সমন্বয়ে Direct Benefit Transfer-এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। পরে UPI ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে ওঠে। আজকের ভারতে মোবাইলের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডে টাকা পাঠানোর যে অভ্যাস সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, তার পিছনে তৈরি হওয়া ডিজিটাল পরিকাঠামোর একটি বড় অংশ এই সময়ের।
২০১৭ সালে Goods and Services Tax বা GST চালু হওয়াও মোদি সরকারের প্রথম দিকের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সংস্কার। বহু ধরনের পরোক্ষ করকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে BJP ফের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ৩০ মে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন নরেন্দ্র মোদি।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই আসে জম্মু ও কাশ্মীর সংক্রান্ত বড় সাংবিধানিক পরিবর্তন। ২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের বিশেষ ব্যবস্থাগুলি কার্যত বাতিল করা এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। সিদ্ধান্তটি ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে এবং এখনও তা নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে।
এরপর আসে কোভিড-১৯ মহামারি। দেশজুড়ে লকডাউন, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর চাপ, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং কর্মসংস্থানের সংকটের মধ্যে সরকারকে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। পরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টিকাকরণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। CoWIN-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে টিকাকরণ ব্যবস্থাপনাও করা হয়।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এই সময় একাধিক প্রকল্পের বিস্তার ঘটে। আয়ুষ্মান ভারত, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন, উজ্জ্বলা এবং জনধনের মতো প্রকল্পকে সরকার দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরে।
এর পাশাপাশি ২০২৩ সালে সংসদে নারী সংরক্ষণ সংক্রান্ত সাংবিধানিক সংশোধনী পাস হয়। লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, যদিও এর কার্যকর প্রয়োগ পরবর্তী সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও জনগণনার সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে অযোধ্যার রাম মন্দিরও মোদি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম প্রতীকী অধ্যায়। দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের পর সুপ্রিম কোর্টের ২০১৯ সালের রায়ের ভিত্তিতে রাম মন্দির নির্মাণের পথ খুলে যায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অযোধ্যায় রাম মন্দিরে রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। BJP-র দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে যে বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দলের সমর্থকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এই সময়ে ভারতের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়। ২০২৩ সালে ভারতের G20 সভাপতিত্ব এবং নয়াদিল্লিতে শীর্ষ সম্মেলন ছিল তার একটি বড় উদাহরণ। সেই সম্মেলনেই আফ্রিকান ইউনিয়ন G20-র স্থায়ী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
‘Global South’-এর দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, International Solar Alliance, International Day of Yoga এবং বিভিন্ন বহুপাক্ষিক মঞ্চে ভারতের সক্রিয় ভূমিকা—মোদি সরকারের বিদেশনীতি ও কূটনৈতিক কার্যকলাপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
মহাকাশ গবেষণাতেও ভারতের সাফল্য এই সময় আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। ২০২৩ সালের চন্দ্রযান-৩ অভিযানে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের কাছে সফল অবতরণ করে ভারত। ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এরপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। BJP একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও NDA জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ৯ জুন ২০২৪-এ রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর তৃতীয়বারের শপথ অনুষ্ঠান হয়।
তৃতীয় মেয়াদে সরকারের সামনে এখন ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্য। অর্থনীতি, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, উৎপাদন, সবুজ শক্তি এবং ভারতের আন্তর্জাতিক ভূমিকা—একাধিক ক্ষেত্রকে এই বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
৭৬তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদির জীবনকে তাই একটিমাত্র রাজনৈতিক স্লোগানে আটকে রাখা কঠিন। বডনগরের সাধারণ পরিবার থেকে শুরু করে RSS-এর সাংগঠনিক পর্ব, BJP-র সংগঠক হিসেবে উত্থান, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ১৩ বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং তারপর দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনটি নির্বাচনী ম্যান্ডেট—এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি পর্বই আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে।
মোদির সমর্থকদের কাছে তাঁর জীবন মূলত সীমিত সুযোগ থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসার একটি অনুপ্রেরণার গল্প। বিরোধীদের কাছে তাঁর রাজনীতি ও সরকারের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রয়েছে তীব্র মতপার্থক্য। গণতন্ত্রে দুই দৃষ্টিভঙ্গিই রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।
কিন্তু ইতিহাসের বিচারে একটি বিষয় স্পষ্ট—নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন শুধু তাঁর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়নি, ভারতীয় রাজনীতির ভাষা, নির্বাচনী প্রচারের ধরন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নেতৃত্বের কাঠামোকেও অনেকটাই পরিবর্তন করেছে।
বডনগরের সেই ছোট শহর থেকে দিল্লির ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছনোর গল্প তাই শুধুমাত্র একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত উত্থানের গল্প নয়। এটি স্বাধীনতার পরবর্তী ভারতের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ পরিবর্তনেরও গল্প।
৭৬-এ নরেন্দ্র মোদি—জন্মদিনে সেই পথচলার দিকে ফিরে তাকানো মানে একই সঙ্গে গত ২৫ বছরের ভারতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা।



