অর্ক সানা, সম্পাদক (নজরবন্দি.ইন): ক্ষুদিরাম বসু—নামটি উচ্চারণ করলেই বাঙালির স্মৃতিতে ভেসে ওঠে এক কিশোর বিপ্লবীর মুখ। ১৯০৮ সালের ১১ অগস্ট মুজফফরপুর জেলে ব্রিটিশ সরকারের ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দেন ক্ষুদিরাম বসু। বয়স তখন মাত্র ১৮। মুজফফরপুরে ব্রিটিশ বিচারক ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর বিচার হয় এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ব্রিটিশের ফাঁসির দড়ি তাঁর জীবন শেষ করেছিল, কিন্তু শেষ করতে পারেনি তাঁর নাম—আজও ক্ষুদিরাম বসু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কনিষ্ঠ ও স্মরণীয় বিপ্লবী হিসেবে বেঁচে আছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের (Sukanta Bhattacharya) সেই পংক্তিগুলি আজ যেন ক্ষুদিরামের মতো অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের জন্যই লেখা—
“ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়,
ওদের কাহিনী বিদেশীর খুনে
গুলি, বন্দুক, বোমার আগুনে
আজো রোমাঞ্চকর।”
একশো আঠারো বছর পেরিয়ে গিয়েছে। ব্রিটিশ শাসন নেই, নেই সেই ঔপনিবেশিক আদালত, নেই সেই কারাগারের ভয়ংকর শাসন। কিন্তু ক্ষুদিরাম বসুর গল্প আজও পুরনো হয়নি। বরং সময় যত এগিয়েছে, তাঁর নাম তত বেশি করে জড়িয়ে গিয়েছে স্বাধীনতার মূল্য, তারুণ্যের সাহস এবং আত্মত্যাগের সঙ্গে।
কারণ ক্ষুদিরামের গল্প কেবল একজন বিপ্লবীর ফাঁসির গল্প নয়। এটি এমন এক বয়সের গল্প, যে বয়সে একজন তরুণের সামনে নিজের জীবন গড়ার অসংখ্য সম্ভাবনা খুলে যায়। অথচ সেই বয়সেই ক্ষুদিরাম নিজের জীবনকে দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নের কাছে সঁপে দিয়েছিলেন।
১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মেদিনীপুরের কাছে হাবিবপুর বা মৌবনী গ্রামে জন্ম ক্ষুদিরাম বসুর। বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোয় জায়গাটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুর এলাকার সঙ্গে যুক্ত। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তাঁর জীবন থেমে যায় মুজফফরপুরের ফাঁসির মঞ্চে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের সংগ্রহেও তাঁর জীবনের সময়কাল ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ থেকে ১১ অগস্ট ১৯০৮ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
ক্ষুদিরামের কৈশোর কেটেছিল এমন এক সময়ে, যখন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ শুধু শহরের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তার অভিঘাত পৌঁছেছিল মফস্সল ও গ্রামবাংলাতেও। কিশোর ক্ষুদিরামও সেই আবহ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না।
অল্প বয়সেই ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। বিপ্লবী সংগঠনের পরিমণ্ডলে তিনি প্রবেশ করেন এবং ক্রমে সশস্ত্র বিপ্লবের পথের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। সেই সময় ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সংগঠনগুলি গোপনে সংগঠিত হচ্ছিল। ক্ষুদিরামের নামও সেই অগ্নিযুগের তরুণ বিপ্লবীদের তালিকায় দ্রুত উঠে আসে।
তখন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাও ছিল বিপজ্জনক। আর সশস্ত্র বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অর্থ ছিল যে কোনও মুহূর্তে গ্রেফতার, নির্যাতন অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। ক্ষুদিরাম সেই ঝুঁকি জেনেই পথ বেছে নিয়েছিলেন।
এই গল্পের পরবর্তী অধ্যায় জুড়ে রয়েছে ডগলাস কিংসফোর্ডের নাম। কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কিংসফোর্ড জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য বিপ্লবীদের কাছে ঘৃণিত হয়ে উঠেছিলেন। পরে তাঁকে মুজফফরপুরে বদলি করা হলেও বিপ্লবীদের লক্ষ্য থেকে তিনি সরে যাননি।
১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল রাত। মুজফফরপুরে কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী (Prafulla Chaki) বোমা নিক্ষেপ করেন। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় সেই আক্রমণ। যে গাড়িটিকে কিংসফোর্ডের গাড়ি বলে তাঁরা মনে করেছিলেন, সেটিতে তিনি ছিলেন না। গাড়িতে থাকা দুই ইউরোপীয় মহিলা নিহত হন। ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রকের ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ নথিতেও ৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এর এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
এই ঘটনাই পরে ইতিহাসে মুজফফরপুর ষড়যন্ত্র মামলা (Muzaffarpur Conspiracy Case) নামে পরিচিত বিচারের সূত্রপাত ঘটায়। বিস্ফোরণের পর ব্রিটিশ পুলিশ গোটা এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে ক্ষুদিরাম পালানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হন।
এরপর শুরু হয় বিচার। সরকারি নথি অনুযায়ী, মামলার বিচার শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮। ক্ষুদিরামের পক্ষে একাধিক আইনজীবী দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায় ঘোষণার পর তাঁর আচরণই হয়ে ওঠে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য—মাত্র ১৮ বছরের তরুণ মৃত্যুদণ্ডের কথা শুনেও ভেঙে পড়েননি। সরকারি সাংস্কৃতিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে, রায় শোনার পর তাঁর হাসিমুখ বিচারককেও বিস্মিত করেছিল।
তারপর এল ১১ অগস্ট ১৯০৮।
মুজফফরপুর কারাগার। সামনে ফাঁসির মঞ্চ। বয়স ১৮ বছর। একটি তরুণ জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রস্তুত। কিন্তু সেই মঞ্চে উঠে ক্ষুদিরাম যে সাহস দেখিয়েছিলেন, সেটিই তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে দেয়। সমকালীন সংবাদ প্রতিবেদনেও তাঁর মৃত্যুর সময়কার হাসিমুখ ও দৃঢ়তার কথা উঠে এসেছিল।
এখানেই ক্ষুদিরাম বসুর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
যে সাম্রাজ্য তখন ভারতবর্ষের কোটি কোটি মানুষকে শাসন করছিল, তার কাছে ক্ষুদিরাম ছিলেন মাত্র একজন বন্দি কিশোর। কিন্তু সেই কিশোরকে ফাঁসি দেওয়ার পরও তাঁর নাম মুছে ফেলতে পারেনি ব্রিটিশ শাসন। বরং তাঁর মৃত্যুই তাঁকে বাংলার মানুষের কাছে প্রতীকে পরিণত করে।
আজও বাঙালির ঘরে, মিছিলে, স্মরণসভায়, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে অথবা কোনও বিপ্লবীর স্মরণে হঠাৎ ভেসে ওঠে সেই গান—
“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।”
গানটি ক্ষুদিরামের স্মৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে বহু মানুষের ধারণা, যেন ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় ক্ষুদিরাম নিজেই এই গান গেয়েছিলেন। ইতিহাসের দিক থেকে এমন দাবি প্রমাণিত নয়। গানটি তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রচিত এক লোকপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান। সাধারণভাবে এর রচয়িতা হিসেবে পীতাম্বর দাসের নাম উল্লেখ করা হয়, যদিও রচয়িতা নিয়ে মতভেদও রয়েছে।
পরে গানটি আরও বৃহত্তর বাঙালি সমাজে পৌঁছে যায়। ১৯৫১ সালের ‘বিপ্লবী ক্ষুদিরাম’ ছবিতে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কণ্ঠে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে ১৯৬৬ সালের ‘সুভাষচন্দ্র’ ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের (Lata Mangeshkar) কণ্ঠে গানটি নতুন করে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য নিজেই জানিয়েছিলেন, এক ভিখারির মুখে গানটি শুনে তিনি তা শিখেছিলেন এবং পরে ‘বিপ্লবী ক্ষুদিরাম’ ছবিতে গানটি গেয়েছিলেন।
এই গানেই রয়েছে আরও এক রহস্য—‘অভিরাম’।
গানের একটি বহুল প্রচলিত পাঠে রয়েছে—“অভিরামের দ্বীপচালান মা, ক্ষুদিরামের ফাঁসি।” কিন্তু ‘অভিরাম’ কে? এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট, সর্বসম্মত উত্তর আজও নেই। কোথাও উল্লাসকর দত্তের সঙ্গে নামটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও বলা হয়েছে এটি গীতিকার ব্যবহৃত একটি নাম। আবার মেদিনীপুরের ঐতিহাসিক সূত্রে বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগোর (Hemchandra Kanungo) সঙ্গে ‘অভিরাম’ নামটির যোগসূত্রের দাবি পাওয়া যায়। আনন্দবাজারেও এক চিঠিতে হেমচন্দ্র কানুনগোকেই ‘অভিরাম’ হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি প্রকাশিত হয়েছিল।
এই কারণেই ক্ষুদিরামকে ঘিরে গানটি শুধু আবেগের নয়, ইতিহাসেরও একটি আকর্ষণীয় দলিল হয়ে রয়েছে। একটি গান কীভাবে একজন বিপ্লবীর স্মৃতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে নিয়ে যেতে পারে, তার অসাধারণ উদাহরণ এটি।
তবে ক্ষুদিরামকে স্মরণ করতে গিয়ে একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না। তাঁকে শুধু ‘হাসতে হাসতে ফাঁসিতে যাওয়া কিশোর’ হিসেবে দেখলে তাঁর সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ছোট করা হয়। তিনি এমন একটি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যেখানে ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার ছিল সীমিত, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করা হত এবং স্বাধীনতার দাবি ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সমার্থক।
আজকের ভারত স্বাধীন। তাই ক্ষুদিরামের সময়ের রাজনৈতিক কৌশল, সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বা সেই সময়কার সিদ্ধান্তকে বর্তমানের মানদণ্ডে সরলভাবে বিচার করা যায় না। ইতিহাসের কাজ হল সেই সময়ের প্রেক্ষাপট বোঝা। আর সেই প্রেক্ষাপটে ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতিতে একটি গভীর ছাপ রেখে গিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Rabindranath Tagore) সেই অমর প্রার্থনা—
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”—
ক্ষুদিরামের জীবনকে মনে করিয়ে দেয় এক অন্য আলোয়। তাঁর রাজনৈতিক পথ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ভূমিকার মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু ভয়কে অতিক্রম করে নিজের বিশ্বাসের জন্য শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকার যে সাহস, ক্ষুদিরামের শেষ অধ্যায় তার এক অসামান্য উদাহরণ।
আর সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই কবিতার ভাষায়—
“ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়,
ওদের কাহিনী বিদেশীর খুনে
গুলি, বন্দুক, বোমার আগুনে
আজো রোমাঞ্চকর।”
আজ ১১ অগস্ট। ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যুবার্ষিকী।
শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর ছবি পোস্ট করে কিংবা একদিনের দেশাত্মবোধক আবেগে তাঁকে আটকে রাখার দিন নয় আজ। বরং আজ মনে করার দিন—এই স্বাধীনতার পিছনে কত অল্পবয়সী মানুষ তাঁদের ভবিষ্যৎকে বিসর্জন দিয়েছিলেন।
১৮ বছর বয়স।
আজকের দিনে যে বয়সে একজন তরুণ নিজের পড়াশোনা, পেশা, প্রেম, পরিবার আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করে, সেই বয়সেই ক্ষুদিরাম বসু মৃত্যুকে সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর হাতে ছিল না রাষ্ট্রক্ষমতা, ছিল না সেনাবাহিনী। ছিল এক ভয়ংকর সাহস এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন।
সেই কারণেই ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যু আসলে শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
ফাঁসির দড়ি তাঁর শরীরকে থামিয়েছিল, ইতিহাসকে নয়। মুজফফরপুরের কারাগারের দরজা তাঁর জন্য বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু তাঁর নামের দরজা বন্ধ হয়নি কখনও।
আজও যখন কোথাও গেয়ে ওঠে—“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি”, তখন মনে হয়, ইতিহাসের বহু দূর থেকে সেই কিশোর যেন আবার ফিরে এসেছে।
হয়তো এটাই ক্ষুদিরাম বসুর সবচেয়ে বড় জয়।
একজন মানুষকে ফাঁসি দেওয়া যায়। কিন্তু যে নাম মানুষের স্মৃতিতে স্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত হয়, তাকে ফাঁসি দেওয়া যায় না।



