মোহন ভাগবতের (Mohan Bhagwat) নিউ ইয়র্ক সফর ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) প্রধানের ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনের অনুষ্ঠানের মাঝেই সংগঠনটির বিরুদ্ধে সরব হল আমেরিকার আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত কমিশন (USCIRF)। কমিশনার ড. আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেছেন, RSS-এর মতো সংগঠন ঘৃণা ছড়াচ্ছে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের পরিসরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে একইসঙ্গে ভাগবতের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসার আগ্রহও জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সময় শনিবার দুপুর ২টো নাগাদ নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে সভা করেন RSS প্রধান। আয়োজকদের দাবি, প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, এটি কোনও রাজনৈতিক সভা নয়; বরং বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঐক্য এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরির উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছিল।
RSS-এর তরফেও অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যকে ‘ওপেন ডায়লগ’ বা মুক্ত আলোচনার মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য, বিভিন্ন মত ও পরিচয়ের মানুষের মধ্যে আলোচনা এবং মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। কিন্তু অনুষ্ঠানকে ঘিরে সমালোচনা থামেনি।
USCIRF কমিশনার ড. আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, RSS-এর মতো সংগঠন বিদ্বেষ ছড়ানোর পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করছে। তাঁর বক্তব্যে ভারতের প্রতি শ্রদ্ধার কথা থাকলেও RSS-এর ভূমিকা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ যথেষ্ট গভীর বলেই স্পষ্ট হয়েছে।
তবে সরাসরি সংঘাতের পথে না গিয়ে ভাগবতের সঙ্গে আলোচনায় বসার দরজাও খোলা রেখেছেন মাহমুদ। তাঁর বক্তব্য, সুযোগ পেলে RSS প্রধানের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনা করতে তিনি প্রস্তুত। এমন কথোপকথন থেকে যদি কোনও আশ্বাস বা নিশ্চয়তা পাওয়া যায়, তাহলে নিজের বর্তমান অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দেননি।
অর্থাৎ, অভিযোগের জায়গা থেকে সরে না গেলেও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ করেননি USCIRF কমিশনার। এই অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। কারণ RSS ও তার সহযোগী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে USCIRF-এর সমালোচনা নতুন নয়।
এর আগেও একাধিকবার RSS-সহ সংঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করেছে USCIRF। এমনকি নিষেধাজ্ঞার দাবিও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ফলে নিউ ইয়র্কে ভাগবতের সফরের সময় নতুন করে ওঠা এই অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন মন্তব্য হিসেবে দেখছে না রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
ভাগবতের অনুষ্ঠানের বিরোধিতায় সরব হয়েছে নিউ ইয়র্কের কয়েকটি আন্তঃধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার সংগঠনও। তাঁদের বক্তব্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবাধিকারের মতো বিষয় নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে RSS প্রধানের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কয়েকদিন আগেই সংঘ পরিবারকে নিশানা করেছিলেন নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি (Zohran Mamdani)।
এখানেই বিতর্কের অন্য একটি দিক সামনে এসেছে। আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে ভারত-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরব। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, নিজেদের দেশের বৈষম্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে কি ওয়াশিংটনের নৈতিক অবস্থান সবসময় প্রশ্নাতীত?
আমেরিকার ইতিহাসে বর্ণবৈষম্য একটি দীর্ঘ ও গভীর অধ্যায়। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য, পুলিশি হিংসা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক বহু দশক ধরে মার্কিন সমাজকে নাড়া দিয়েছে। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসের পরও সেই বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলির একটি জর্জ ফ্লয়েড (George Floyd)। ২০২০ সালে মিনিয়াপোলিসে পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যুর পর আমেরিকা-সহ গোটা বিশ্বে বর্ণবৈষম্য ও পুলিশি হিংসার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। ‘Black Lives Matter’ আন্দোলন নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
তাই মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্ক সফরকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক শুধু RSS বনাম USCIRF-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। একদিকে ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মার্কিন সমালোচনা, অন্যদিকে আমেরিকার নিজের বর্ণবৈষম্যের ইতিহাস—দুই দিক নিয়েই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এখন দেখার, অভিযোগ-প্রতিআভিযোগের বাইরে ভাগবত ও USCIRF-এর মধ্যে সত্যিই কোনও সরাসরি সংলাপ হয় কি না।



