জেলবন্দি অবস্থাতেই কি হকি বেঙ্গলের (Hockey Bengal) সভাপতি পদে ফিরলেন রাজ্যের প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু? ১৪ অক্টোবর সংগঠনের বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম (AGM)-এর পর প্রকাশিত বৈঠকের কার্যবিবরণীতে সভাপতি হিসেবে তাঁর নাম থাকায় উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। অভিযোগ, বর্তমান সভাপতি নন্দকিশোর রাইকে কোনও নোটিস না দিয়েই ওই বৈঠক ডাকা হয়েছিল। এমনকী, বৈঠকের বৈধতা এবং কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের পদ্ধতি নিয়েও আপত্তি তুলেছেন সংগঠনের একাধিক পদাধিকারী। বিষয়টি জানিয়ে রেজিস্ট্রার অফ ফার্মস, সোসাইটিজ অ্যান্ড নন-ট্রেডিং কর্পোরেশনকে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন নন্দকিশোর।
পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে জেলবন্দি রয়েছেন সুজিত বসু। ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court) তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে।
তাঁর গ্রেপ্তারির পর হকি বেঙ্গলের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন সংগঠনের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নন্দকিশোর রাই। কিন্তু ১৪ অক্টোবরের এজিএমের কার্যবিবরণীতে ফের সুজিতের নাম সভাপতি হিসেবে উঠে আসায় সংগঠনের অন্দরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নন্দকিশোর রাইয়ের অভিযোগ, ১৪ অক্টোবরের এজিএম ডাকার ক্ষেত্রে সংগঠনের নির্দিষ্ট নিয়ম মানা হয়নি। তাঁর দাবি, সভাপতি হিসেবে তাঁকে বৈঠকে যোগ দেওয়ার কোনও নোটিস পাঠানো হয়নি। অথচ ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে ১৫ সদস্যের নিয়মিতকৃত কার্যনির্বাহী কমিটির তালিকায় সবার প্রথমে সভাপতি হিসেবে নাম রয়েছে সুজিত বসুর।
বৈঠকে ‘ন্যাশনাল স্পোর্টস গভর্ন্যান্স অ্যাক্ট, ২০২৫’ সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়েছে বলেও কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু নন্দকিশোরের বক্তব্য, তাঁকে এবং যুগ্ম সচিব সুরভি মিত্রের মতো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে বৈঠকের বিষয়ে জানানোই হয়নি।
তাঁর আরও অভিযোগ, কার্যনির্বাহী কমিটিতে দু’জন অ্যাডাপ্টেড সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্পোর্টস কোডের নিয়ম মানা হয়নি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, সুজিত বসু ফের সভাপতি হয়েছেন, এমন খবর তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল এবং পরিবারের সদস্যদের কাছেও ছিল না বলে দাবি করা হচ্ছে।
কেন তাঁকে সভাপতির দায়িত্ব থেকে সরানো হল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নন্দকিশোর। তাঁর দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পরেই হকি বেঙ্গলের আর্থিক লেনদেন নিয়ে একাধিক অসংগতি তাঁর নজরে আসে।
নন্দকিশোরের বক্তব্য, বাংলায় হকির প্রচার ও প্রসারের জন্য হকি ইন্ডিয়া (Hockey India) যে অর্থ বরাদ্দ করেছিল, তার ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। দিল্লি হাই কোর্টের নির্দেশে ডিজিটাল অডিটের উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু সেই চিঠির উত্তর দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় তিনি বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি এবং কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তাঁর অভিযোগ, ২০১৮ সাল থেকে দার্জিলিং-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় হকির উন্নয়নের জন্য কোথাও ৯ লক্ষ, কোথাও ১০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে বলে হিসাব দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই টাকায় কী কাজ হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিদের কাছেও স্পষ্ট তথ্য নেই।
২০২১-২২ সালে প্রথম উইমেন্স ডিপার্টমেন্টাল ন্যাশনাল হকি টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য তৎকালীন রাজ্য সরকার প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা দিয়েছিল। সেই অর্থেরও অধিকাংশের যথাযথ ব্যবহার হয়নি বলে অভিযোগ নন্দকিশোরের। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
হকি বেঙ্গলের সেক্রেটারি জেনারেল ইস্তিয়াক আলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নন্দকিশোর। তাঁর অভিযোগ, রেলের আধিকারিক হওয়া সত্ত্বেও ইস্তিয়াক নির্ধারিত মেয়াদের বেশি সময় ধরে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। পাশাপাশি তাঁর হস্তক্ষেপেই ১৪ অক্টোবরের এজিএম ডেকে সুজিত বসুকে ফের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
নন্দকিশোরের বক্তব্য, আর্থিক অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর থেকেই সংগঠনের ভিতরে তাঁর অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূতভাবে এজিএম ডেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইস্তিয়াক আলি। তাঁর দাবি, হকি বেঙ্গলের কোনও নিয়ম ভাঙা হয়নি। নতুন স্পোর্টস কোড অনুযায়ী ২০২৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে কোনও পদাধিকারীকে সরাতে গেলে তাঁকে আইনি ভাবে দোষী সাব্যস্ত হতে হবে অথবা নিয়ম মেনে নোটিস দিতে হবে।
ইস্তিয়াকের বক্তব্য, সুজিত বসুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি। তিনি জেলে রয়েছেন বলে তাঁকে নোটিস পাঠানো সম্ভব হয়নি। নতুন স্পোর্টস কোড অনুযায়ী এজিএমের মাধ্যমে ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করা যায়। প্রয়োজনে পরবর্তী এজিএমে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করা সম্ভব। নিজের পদে দীর্ঘদিন থাকার অভিযোগের জবাবে তাঁর দাবি, সরকারি কর্মী বা আধিকারিকদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তিনটি টার্ম পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের এনওসি নিয়েই তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
হকি বেঙ্গলের প্রাক্তন সভাপতি স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ২০২৪ সালে তাঁর জায়গাতেই সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন সুজিত বসু। সেই সুজিতের জেলবন্দি অবস্থায় ফের সভাপতি হওয়ার খবর শুনে স্বপন জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না।
তাঁর বক্তব্য, সত্যিই যদি জেলবন্দি অবস্থায় সুজিতকে সভাপতি করা হয়ে থাকে, তা হলে বিষয়টি নিয়মবহির্ভূত হতে পারে। সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ইস্তিয়াক আলির দীর্ঘদিন ধরে পদে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, হকি বেঙ্গলের যুগ্ম সচিব সুরভি মিত্রের অভিযোগ, পদে থাকা সত্ত্বেও তাঁকে এজিএমে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য, কোনও জেলার প্রতিনিধি নন বলে তাঁকে বৈঠকে রাখা হয়নি। গোটা প্রক্রিয়াটিই নিয়মবহির্ভূত বলে দাবি তাঁর।
উল্লেখযোগ্যভাবে, হকি ইন্ডিয়ার প্রকাশিত সদস্য সংগঠনগুলির তালিকাতেও সভাপতির নাম নিয়ে ভিন্ন তথ্য দেখা যাচ্ছে। একটি প্রকাশিত তালিকায় সুজিত বসুর নাম থাকলেও অন্য একটি তালিকার সংস্করণে নন্দকিশোর রাইয়ের নাম রয়েছে। ফলে সংগঠনের বর্তমান প্রশাসনিক অবস্থান নিয়েও অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে হকি বেঙ্গলের সভাপতি নির্বাচন, এজিএমের বৈধতা এবং সংগঠনের আর্থিক হিসাব—তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। নন্দকিশোরের অভিযোগের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রারের দফতর কী পদক্ষেপ করে, পাশাপাশি রাজ্যের ক্রীড়া দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে কি না, এখন সেদিকেই নজর।



