ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়েছে আরও একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে থাকা গভীর নিম্নচাপটি দ্রুত শক্তি বাড়াচ্ছে। রবিবারই সেটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। এরপর সোমবার পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়ে ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের নেল্লোর ও নারসাপুরের মধ্যবর্তী এলাকায় আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির নাম ‘মুরাসু’। তবে পশ্চিমবঙ্গে এর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আপাতত কম। যদিও বঙ্গের কয়েকটি জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছে।
শনিবার তৈরি হওয়া নিম্নচাপটি রবিবার সকালে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার ভোর সাড়ে ৫টায় সেটি দক্ষিণ-পূর্ব ও সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছিল। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরে আরও শক্তিশালী হয়ে মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। উপকূল অতিক্রমের সময় ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার হতে পারে, দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ পৌঁছতে পারে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারে।
মঙ্গলবার অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে ‘মুরাসু’
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি ক্রমশ পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে এগোচ্ছে। সোমবার, ২ নভেম্বর পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে এটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশের নেল্লোর থেকে নারসাপুরের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
উপকূল অতিক্রমের সময় ঘণ্টায় ১০০-১১০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং রায়লসীমায় ২ ও ৩ নভেম্বর ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। দক্ষিণ ওড়িশার কয়েকটি জেলাতেও ৩ ও ৪ নভেম্বর ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।
আজ কলকাতার আবহাওয়া কেমন থাকবে?
রবিবার সকালে কলকাতার আকাশ মূলত রোদ ঝলমলে থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে মেঘের আনাগোনা বাড়তে পারে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি বজায় থাকবে। কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
আবহাওয়া সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, কলকাতায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকতে পারে। সোমবারও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। মঙ্গলবার বৃষ্টির প্রবণতা কমতে পারে।
কলকাতার আবহাওয়া: ১-৪ নভেম্বর
আজ সর্বোচ্চ
৩৪°C
আজ সর্বনিম্ন
২৫°C
১ নভেম্বর, রবিবার
বিক্ষিপ্ত বজ্রবৃষ্টি
২ নভেম্বর, সোমবার
হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা
৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার
মূলত মেঘলা, বৃষ্টির সম্ভাবনা কম
৪ নভেম্বর, বুধবার
বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে
আবহাওয়ার পূর্বাভাস পরিবর্তনশীল।
দক্ষিণবঙ্গের কোন কোন জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা?
আপাতত দক্ষিণবঙ্গে ভারী বৃষ্টির কোনও বড় সতর্কতা নেই। তবে ১ থেকে ৩ নভেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি কিংবা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় স্থানীয় আবহাওয়ার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছে। তবে সর্বত্র একসঙ্গে বৃষ্টি হবে, এমন পূর্বাভাস নেই।
৪ নভেম্বর থেকে দক্ষিণবঙ্গের অধিকাংশ জেলায় আবহাওয়া মূলত শুষ্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আপাতত ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর সরাসরি প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা দেখছে না আবহাওয়া দপ্তর।
উত্তরবঙ্গের আবহাওয়ায় কী পরিবর্তন?
উত্তরবঙ্গেও আপাতত আকাশ আংশিক মেঘলা থাকার সম্ভাবনা। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের কয়েকটি জায়গায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। মালদহ, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুরেও বিচ্ছিন্নভাবে হালকা বৃষ্টি হতে পারে।
আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টির প্রবণতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। ৪ নভেম্বরের পর উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ জেলায় আবহাওয়া শুষ্ক হতে পারে। ফলে আপাতত ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা না থাকলেও পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা
সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তাল হতে পারে। বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল এবং সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া ও ঢেউয়ের উচ্চতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২ থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে যাঁরা গভীর সমুদ্রে রয়েছেন, তাঁদের দ্রুত উপকূলে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মৎস্যজীবীদের আবহাওয়া দপ্তরের পরবর্তী নির্দেশিকা মেনে চলতে বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’ নিয়ে মূল উদ্বেগ অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ভারতের উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে। পশ্চিমবঙ্গে সরাসরি ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের আশঙ্কা আপাতত নেই। তবে আগামী কয়েক দিন দুই বঙ্গের কিছু জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছে।



